টেলিভিশনের পর্দার সামনে দীর্ঘ সময় কাটানো অনেকেরই অভ্যাস। কিন্তু এই অভ্যাসের ফলে শরীরের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে সম্প্রতি এক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কয়েক দশক পর মস্তিষ্কের কিছু অংশের আকার ছোট হয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে যে অংশগুলো চিন্তাভাবনা ও ভাষার দক্ষতা নিয়ন্ত্রণ করে।
আলঝেইমার অ্যান্ড ডিমেনশিয়া নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি পরিচালিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের (এনআইএইচ) অধীনে। দীর্ঘমেয়াদি এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেন ১ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষ। তাঁদের বয়স ছিল ৪৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে, আর গড় বয়স ছিল ৫৩ বছর। অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল গত এক বছরে তাঁদের টেলিভিশন দেখার হার কতটুকু ছিল। এ ক্ষেত্রে উত্তর হিসেবে পাঁচটি বিকল্প ছিল—কখনোই না, কদাচিৎ, মাঝেমধ্যে, প্রায়ই এবং খুব ঘন ঘন।
গবেষণার দুই দশকেরও বেশি সময় পরে অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান করা হলে দেখা যায়, যাঁরা ‘খুব ঘন ঘন’ টেলিভিশন দেখতেন, তাঁদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশের আকার অন্যদের তুলনায় ছোট। স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট এই অংশগুলো মূলত চিন্তাভাবনা এবং ভাষাগত দক্ষতার সাথে জড়িত। এ ছাড়া আলঝেইমার রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মস্তিষ্কের অংশগুলোর আকারও ছোট দেখা গেছে। মস্তিষ্কে এমন পরিবর্তনও লক্ষ করা গেছে, যার সঙ্গে ভবিষ্যতে রক্তনালির ক্ষতি হওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে এবং যা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন যে, নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমে। তবে এই গবেষণার ফলাফল বলছে ভিন্ন কথা। দেখা গেছে, নিয়মিত ব্যায়াম করলেও ডিমেনশিয়ার সব ঝুঁকি দূর হয় না। অর্থাৎ, কেউ যদি দৈনিক দীর্ঘ সময় টিভির সামনে কাটানোর পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চাও করেন, তবুও তাঁর মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের অবনতির আশঙ্কা থেকে যায়।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি সম্পূর্ণ টিভি দেখা বন্ধ করে দিতে হবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাধুলা বা চলচ্চিত্রের মতো অনুষ্ঠান দেখলে মনে স্বস্তি আসে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো এবং পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতেও সহায়ক। কিন্তু মূল বিষয় হলো দেখা যাচ্ছে কতক্ষণ ধরে টেলিভিশন দেখছি। যদি দীর্ঘ সময় টিভি দেখার কারণে ব্যায়াম, পড়াশোনা বা অন্যান্য সামাজিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে তা মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অফিসে বসে কাজ করলে টেলিভিশন দেখার মতো মস্তিষ্কের ক্ষতি হয় না। কারণ হিসেবে গবেষকেরা বলেছেন, টিভি দেখার সময় শুধু তথ্য গ্রহণ করা হয়, কিন্তু অফিসে কাজ করতে গিয়ে ই-মেইল আদান-প্রদান, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগসহ নানা কাজ করতে হয়, ফলে মস্তিষ্ক বেশি সক্রিয় থাকে। মস্তিষ্কের এই সক্রিয়তা ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
তবে গবেষকেরা এ-ও জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র দীর্ঘ সময় টিভি দেখার কারণেই যে মস্তিষ্কের অংশগুলোর আকার কমে যায়, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তাঁদের মতে, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ওজন, শারীরিক কর্মকাণ্ড, ধূমপান, মদ্যপান, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো বিষয়গুলোও এই ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে।




