একসময় প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়মিত আলাপচারিতা ছিল মার্কিন সমাজের অপরিহার্য অংশ, কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশটির মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষ এখন নিয়মিত তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেন, অথচ ২০১২ সালে এই হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার এই চরম পতনের ফলে সমাজ দিন দিন ঘরমুখী ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সার্ভে সেন্টার অন আমেরিকান লাইফের পরিচালক ড্যানিয়েল কক্সের নেতৃত্বে পরিচালিত 'স্ট্রেঞ্জারস নেক্সট ডোর' শীর্ষক এই গবেষণা বলছে, গত এক দশকেরও কম সময়ে তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রতিবেশীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের হার ৫১ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা সবচেয়ে তীব্র পতন। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই হার কিছুটা কম, ৫৬ শতাংশ মানুষ এখনও সাপ্তাহিকভাবে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেন।
এই নীরবতার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। অ্যাপ-ভিত্তিক সেবার কারণে মানুষের মধ্যে একে অপরের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। কোনো কাজের জন্য আর কাউকে ফোন করে ডাকতে হয় না, বরং অনলাইনে অর্ডার করলেই সব মিলে যায়। একই সঙ্গে সর্বজনীন রেকর্ডিং ও সম্প্রচারের যুগে ভুল করার ভয়ও মানুষকে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ড্যানিয়েল কক্স বলেন, “মানুষ এখন আর ক্লাবে নাচতে চায় না, কারণ তারা ভয় পায় যে কিছু ভুল করলে সবাই তা রেকর্ড করে ছড়িয়ে দেবে।” এই ভয় তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রকট, যাদের জন্য সমবয়সীদের স্বীকৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি, শৈশবের লালন-পালনেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান তরুণরা নিজেদের 'অসাধারণ' হিসেবে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয়েছেন, যা তাদের পরিবার বা সম্প্রদায়ের বদলে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক করে তুলেছে। ফলে সমাজে অবদান রাখার বদলে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। শিক্ষা, আস্থা এবং পারিবারিক শিকড়ের গভীরতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের মানেও বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কলেজ-শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রতিবেশীদের প্রতি আস্থা ৮১ শতাংশ, যেখানে উচ্চমাধ্যমিকের কম শিক্ষিতদের মধ্যে তা মাত্র ৬৪ শতাংশ। জরুরি প্রয়োজনে প্রতিবেশীর কাছে সন্তান রাখার প্রশ্নে কলেজ-শিক্ষিত অভিভাবকদের অর্ধেকের বেশি আগ্রহী, কিন্তু অন্যান্য অভিভাবকদের মধ্যে এই হার ৪০ শতাংশেরও কম।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় উপাসনালয়, শ্রমিক সংগঠন বা সামাজিক ক্লাবগুলোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একত্রিত করত, কিন্তু সেগুলোর পতনে সেই কাঠামোগুলো ভেঙে পড়েছে। এখন একই বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে হলে সচেতন পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়, যা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে গবেষণায় একটি ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে—যারা নিয়মিত নিজেদের এলাকায় হাঁটেন বা দৌড়ান, তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কক্সের মতে, পরিবেশ এমন হওয়া দরকার যাতে মানুষ স্বাভাবিকভাবে একে অপরের সংস্পর্শে আসতে পারে। একটি ছোট মুদি দোকান বা পার্ক এমন একটি জায়গা হতে পারে, যেখানে দেখা হওয়াটা অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং সেই সুযোগেই গড়ে ওঠে সামাজিক বন্ধন।




