চলতি জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামে আট দিনে ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ১৯৫৩ সাল থেকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টির এই পরিমাণ গত ৭৩ বছরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তবে এবারের ঘটনা শুধু একটি স্টেশনের রেকর্ড নয়, একই সময়ে কক্সবাজার, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, বান্দরবান ও রাঙামাটিসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব আবহাওয়া স্টেশনেই ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ। তাঁর মতে, অতীতে কোনো একটি বা দুটি স্টেশনে রেকর্ড বৃষ্টি হলেও এবার বৃষ্টির বিস্তার পুরো অঞ্চলজুড়ে ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ৫ জুলাই চট্টগ্রামে ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। পরের দিন তা বেড়ে ২৮৩ মিলিমিটার, ৭ জুলাই ২৮৪, ৮ জুলাই ২৪৯ ও ৯ জুলাই ২১১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এরপর ১০ জুলাই ২৮, ১১ জুলাই ৯৮ ও ১২ জুলাই ১৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে আট দিনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে ২৪ ঘণ্টায় ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিকে অতি ভারী বৃষ্টি ধরা হয়। সেই হিসাবে আট দিনের মধ্যে সাত দিনই চট্টগ্রাম ছিল অতি ভারী বৃষ্টির আওতায়।
এ সময় বান্দরবানে ১ হাজার ১০২ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ৮৪৬, সন্দ্বীপে ৭৬৮, সীতাকুণ্ডে ৬৭৬, রাঙামাটিতে ৬৪৬ ও হাতিয়ায় ৫৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। কুতুবদিয়ায় সাত দিনের তথ্যে বৃষ্টির পরিমাণ ৯৯২ মিলিমিটার, সেখানে শুধু ৮ জুলাই এক দিনেই বৃষ্টি হয়েছে ৩০০ মিলিমিটার। অর্থাৎ পুরো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল কয়েক দিন ধরে প্রবল বর্ষণের ভেতরে ছিল। এক দিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড না হলেও আট দিনের মোট বৃষ্টির পরিমাণ চট্টগ্রামের আগের বড় বর্ষণ পর্বগুলোর প্রায় দ্বিগুণ। ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রামে সাত-আট দিনে মোট বৃষ্টি ছিল ৭৫৭ মিলিমিটার, ১৯৫৩ সালে ৬৮৬ ও ১৯৮৫ সালে ৭৬৪ মিলিমিটার। এবারের বৃষ্টি সে তুলনায় প্রায় ৬৯০-৭০০ মিলিমিটার বেশি।
দেশের এক দিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড এখনো ২০০১ সালের জুনে সন্দ্বীপের, যেখানে ১৪ জুন ৫৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। ওই বছর ১৪ থেকে ২১ জুন পর্যন্ত আট দিনে সন্দ্বীপে মোট ১ হাজার ৯৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। তবে সেসময় বৃষ্টি মূলত সন্দ্বীপ ও হাতিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল। এবার চট্টগ্রাম নগরী থেকে কক্সবাজার, উপকূলের সন্দ্বীপ-হাতিয়া এবং তিন পার্বত্য জেলায় একই সময়ে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে।
এই অতিবৃষ্টির আগে কয়েক মাস ধরে আবহাওয়ার ছন্দে একের পর এক ব্যতিক্রম দেখা গেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ২০২৬ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় চার মাস দেশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়নি। আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, শীতকালে সাধারণত পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হয়। কিন্তু গত শীতে পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাব ছিল না বললেই চলে। মার্চের শেষ দিকে এসে একটি বড় পশ্চিমা লঘুচাপ উপমহাদেশজুড়ে দীর্ঘ বৃষ্টিবলয় সৃষ্টি করে।
এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। সিলেটে ওই মাসে ৬০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এপ্রিলে দেশজুড়ে তাপপ্রবাহ দীর্ঘ হতে পারেনি, তিন দিনের বেশি স্থায়ী হয়নি। অথচ সাধারণত এপ্রিলেই দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ তাপপ্রবাহ ঘটে। জুন মাসে পরিস্থিতি উল্টে যায়। সারা দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। একই মাসে তিন দফায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০ থেকে ১২ দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের মতে, বৃষ্টিবহুল জুনে এভাবে কয়েক দফায় দীর্ঘ তাপপ্রবাহ থাকা অস্বাভাবিক।
এত বৃষ্টির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। সক্রিয় মৌসুমি বায়ু কয়েক দিন ধরে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এনেছে। একই সঙ্গে অনুকূল বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি বৃষ্টির মেঘকে একই অঞ্চলে বারবার তৈরি হতে সহায়তা করেছে। পাহাড়ি এলাকায় বাধা পেয়ে বায়ু ওপরে উঠে শীতল হয়ে মেঘ ও বৃষ্টি তৈরি করে। এবার মৌসুমি বায়ু শক্তিশালী ও দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশের অন্য এলাকার তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এল নিনোর প্রভাবও কাজ করেছে। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এল নিনোর কারণে কনভারজেন্স ও ডাইভারজেন্স জোনের স্বাভাবিক অবস্থানে পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ঘূর্ণিবায়ুর আবর্তন অত্যন্ত সুসংগঠিত হয়ে ওঠে এবং পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে ব্যাপক বৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বর্ষণ আমাদের জন্য আগামীর বড় ধরনের বিপর্যয়ের একটি বার্তা তুলে ধরেছে। আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নগর-পরিকল্পনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রকৃতির এই বৈরী আচরণ বিবেচনায় নিতেই হবে।’ এই দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি চট্টগ্রামের পানি অপসারণব্যবস্থা, খাল ও নালার সীমাবদ্ধতা এবং পার্বত্য এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। উপকূলে একই সময়ে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ার হলে পানি নামতে আরও সময় লাগে। তাই প্রশ্নটি শুধু কত মিলিমিটার বৃষ্টি হলো তা নয়, বরং কেন অল্প সময়ে এত বিপুল পানি ঝরছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে এই পরিবর্তিত ছন্দের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যাবে—সেটিই বাংলাদেশের আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



