ইউরোপে এবারের গ্রীষ্মকাল শুরু হয়েছে উদ্বেগজনকভাবে। রেকর্ড পরিমাণ তাপপ্রবাহের কারণে জুন মাসের শেষের দিকে মৃত্যুর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে, যাদের অধিকাংশই বয়স্ক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপজনিত কারণে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে সরাসরি তাপকে চিহ্নিত করা হয় না। যেমন, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুকে শুধু হৃদরোগ হিসেবেই নথিভুক্ত করা হয়, যদিও তাপপ্রবাহ তার ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষণা সংস্থা ইউরোমোমোর তথ্য অনুযায়ী, ২৮ জুন শেষ হওয়া সপ্তাহে প্রায় ১৪ হাজার ২৬০ জন অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১২ হাজারের বেশি ছিলেন ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী। ওই সপ্তাহে মোট মৃত্যু ছিল ৮৪ হাজার ৫৮৩ জন। ডেনমার্কের স্ট্যাটেনস সিরাম ইনস্টিটিউটের সঞ্চালক লাসে ভেস্টারগার্ড জানান, “এই অতিরিক্ত মৃত্যুর জন্য আমরা তাপপ্রবাহকেই দায়ী করছি, কারণ সে সময় এমন কোনো অন্য কারণ ছিল না যা এত বেশি মৃত্যু ব্যাখ্যা করতে পারে।” তিনি আরও বলেন, এক সপ্তাহে এত উচ্চ মৃত্যুহার “অত্যন্ত অস্বাভাবিক”। ইউরোমোমো দেশভিত্তিক সংখ্যা প্রকাশ না করলেও জানায়, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও জার্মানিতে অতিরিক্ত মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
জার্মানির রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট বলছে, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশটিতে তাপজনিত কারণে ৬ হাজার ৮৩০ জন মারা গেছে, যাদের মধ্যে ৬ হাজার ৪৭০ জনের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। জার্মান আবহাওয়া পরিষেবা জানায়, গত মাসের শেষের দিকে দেশটির তাপমাত্রা রেকর্ড সর্বোচ্চ ছুঁয়েছে, ২৮ জুন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা মেট অফিস জানায়, মে ও জুন মাসে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে তাপপ্রবাহের কারণে প্রায় ২ হাজার ৭০০ জন মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদের মধ্যে প্রায় ৫৫০ জন মে মাসের শেষ দিকে এবং প্রায় ২ হাজার ২০০ জন জুনের শেষ দিকে মারা গেছেন। চলতি বছর মে মাসে দেশটির জাতীয় তাপমাত্রা রেকর্ড ৩৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং জুনে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ২২-২৮ জুন সপ্তাহে আগের সপ্তাহের তুলনায় অন্তত ২ হাজার বেশি মৃত্যু হয়েছে। ফ্রান্সে ২৪ ও ২৫ জুন ছিল রেকর্ড সবচেয়ে উষ্ণ দিন, যখন মেটিও ফ্রান্সের জাতীয় তাপ সূচক ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। দেশটির ৪০ শতাংশের বেশি এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে ছিল।
স্পেনের কার্লোস তৃতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মতে, জুন মাসে স্পেনে তাপপ্রবাহের কারণে আনুমানিক ৯৩৭ জন মারা গেছে। গত মাসটি দেশটির দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন ছিল, যেখানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। পাঁচ দিনের তাপপ্রবাহে তাপমাত্রা নিয়মিত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে।
বেলজিয়ামের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সায়েনসানো জানায়, ১৮ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত তাপপ্রবাহের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে ১ হাজার ৭৪৭ জন বেশি মৃত্যু হয়েছে। তারা বলছে, “তাপপ্রবাহের সময় কিছু অতিরিক্ত মৃত্যু স্বাভাবিক, তবে ২০২৬ সালের জুনের তাপপ্রবাহ তার ব্যতিক্রমী বিস্তারের কারণে আলাদা।” তাপপ্রবাহের শীর্ষে, ২৬ জুন তাপমাত্রা ছিল ৩৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
নেদারল্যান্ডসের জনস্বাস্থ্য পরিষেবার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জুনের তাপপ্রবাহে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৮০ জন বেশি মৃত্যু হয়েছে। পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি ছিল, যেখানে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ছিল। দেশটির জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯৪৭ সালের পূর্ববর্তী রেকর্ডের চেয়ে প্রায় এক ডিগ্রি বেশি।
উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের ফ্রিকোয়েন্সি ও তীব্রতা বাড়ছে, যা কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফল। ২০০৩ সালে ইউরোপে তাপপ্রবাহে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ। চলতি বছরের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে গ্রীষ্মের শুরুতে ঘটেছে, যা আরও বড় বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।




