বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন অ্যাম্বার জীবাশ্মের সন্ধান পেয়েছেন, যা উদ্ভিদের বিবর্তন নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হুজিয়েরসাইট ফর্মেশনের একটি কয়লাখনি থেকে শত শত অতি ক্ষুদ্র অ্যাম্বার কণা উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলোর বয়স প্রায় ৩৮ কোটি ৫০ লাখ বছর, যা মিডল ডেভোনিয়ান যুগের। এর আগে নিশ্চিত হওয়া সবচেয়ে প্রাচীন অ্যাম্বার লেট কার্বনিফেরাস যুগের ছিল, যা বর্তমান আবিষ্কারের চেয়ে প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর ছোট। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই অ্যাম্বার পৃথিবীতে প্রথম ডাইনোসরের আবির্ভাবেরও প্রায় ১৫ কোটি বছর আগের।

গবেষণার প্রধান লেখক ও চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেসের জীবাশ্মবিদ চিহাং লুও জানান, আগের সবচেয়ে পুরোনো অ্যাম্বার বীজ উৎপাদনকারী উদ্ভিদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। কিন্তু নতুন পাওয়া এই নমুনাগুলো এমন এক সময়ের, যখন বীজযুক্ত উদ্ভিদের অস্তিত্বই ছিল না। এর অর্থ হলো, সাধারণ সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদই বীজ উদ্ভিদের আবির্ভাবের বহু আগে জটিল রাসায়নিক যৌগসমৃদ্ধ রজন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে রজন উৎপাদনের ক্ষমতা উদ্ভিদের বিবর্তনের অনেক আগের একটি কৌশল।

সাধারণত জুয়েলারির অ্যাম্বার লালচে-সোনালি বড় টুকরো হলেও এই প্রাচীন অ্যাম্বার আকারে অত্যন্ত ছোট। গবেষকরা ১০ কেজি কয়লা পরীক্ষা করে মাত্র ২৪১টি অতি ক্ষুদ্র টুকরা খুঁজে পেয়েছেন, যার প্রতিটির আকার ০.১ থেকে ১.৫ মিলিমিটার। এগুলো খালি চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব বলে বিজ্ঞানীরা অতিবেগুনি রশ্মির সাহায্যে শনাক্ত করেন। অতিবেগুনি আলোতে এই কণাগুলো উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়।

প্রাথমিকভাবে এগুলোকে রজনসদৃশ জৈব উপাদান হিসেবে ধরা হলেও পরে অপটিক্যাল টেস্ট, ইনফ্রারেড স্পেক্ট্রোস্কোপি ও মাস স্পেক্ট্রোমেট্রির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এগুলো প্রকৃত অ্যাম্বার। বিজ্ঞানীদের মতে, আদিম বনাঞ্চলে ঘন ঘন দাবানল ও পরজীবী ছত্রাকের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতেই উদ্ভিদ এই আঠালো কষ তৈরি করত। গভীর মূলতন্ত্র, কাঠ ও পাতার বিবর্তনের পাশাপাশি এই রজন তৈরির ক্ষমতা উদ্ভিদকে স্থলভাগে টিকে থাকতে ও বিস্তৃত হতে সাহায্য করেছিল।

চিহাং লুও আরও বলেন, সেটি ছিল পৃথিবীর এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের যুগ। গাছ তখন ক্রমেই লম্বা হচ্ছিল, কাঠে রূপ নিচ্ছিল এবং তাদের মূল কাঠামো মহাদেশের মাটিকে বদলে দিচ্ছিল। এই পুঁচকে অ্যাম্বার কণা সেই মহা পরিবেশগত পরিবর্তনের সময়েই তৈরি হয়েছিল। এই আবিষ্কার শুধু অ্যাম্বারের বয়সের রেকর্ড ভাঙেনি, বরং উদ্ভিদের বিবর্তনের জটিল পথ সম্পর্কেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে।