বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সালেহর মৃত্যুর পর দীর্ঘ আঠারো মাস কেটে গেছে। তাঁর সহধর্মিণী, স্বনামধন্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেহেরুন্নেসা বেগম, এতদিন নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। তবে এই দিনে তিনি প্রথম বারের মতো নিজের গাড়ি নিজেই চালিয়ে বাইরে বের হওয়ার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিলেন। এই ছোট সিদ্ধান্তটি তাঁর জন্য ছিল বিশাল এক মনস্তাত্ত্বিক পদক্ষেপ।

ধানমন্ডির বাড়ির ড্রয়িংরুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের পড়ন্ত বিকেলের ক্লান্ত প্রকৃতি দেখছিলেন তিনি। হঠাৎ তাঁর চোখ আটকে যায় গেটের পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছটিতে। রক্তিম লাল আর হলুদে ছাওয়া এই বৃক্ষটি একসময় ড. আবু সালেহ নিজের হাতে রোপণ করেছিলেন। মেহেরুন্নেসার মনে পড়ে গেল, ছোট সালাউদ্দিন যখন সেন্ট যোসেফে পড়ত, তখন তাঁর স্বামী বলেছিলেন, 'গাছ আর সন্তান আমার কাছে সমান, সময় নিয়ে এদের যত্ন করতে হয়।' সেদিন নারিকেল, আম, কাঁঠালের মতো অনেক গাছই তিনি এই প্রাঙ্গণে বসিয়েছিলেন। গাছগুলো বড় হয়েছে, ছেলেও বড় হয়েছে, কিন্তু স্বামী আর নেই — এই নির্মম সত্যে বুকের ভেতর খাঁ খাঁ করতে থাকে তাঁর।

ঘরের দেয়ালে ঝুলানো যুগল ফোটোতে চোখ পড়তেই ডা. মেহেরুন্নেসা বেগমের মনে হলো, মানুষটি যেন এখনই হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে বলবেন, 'মেহেরু, আজ চারটা বাইপাস করলাম!' এবং একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে যাবেন চেম্বারের উদ্দেশে। স্বভাবতই কম কথা বললেও, মানুষের কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে আন্দোলিত করত। প্রায়ই গভীর রাতে বারান্দায় পায়চারি করতে দেখেছেন তিনি। নিঝুম শহরে একমাত্র তিনি জেগে থাকতেন, যেন প্রতিটি রোগীর স্পন্দন নিজের বুকে অনুভব করছেন। বাড়ির প্রতিটি আসবাবপত্র, এলোমেলো মেডিকেল জার্নাল, পুরনো স্টেথোস্কোপ ও আলনায় ঝোলানো জামাকাপড় — সবকিছুতেই আজও ডাক্তার আবু সালেহর উপস্থিতি বিন্দুমাত্র ধূসর হয়নি। পুত্র বিলাতফেরত ডাক্তার সালাউদ্দিনের নির্দেশে সব জিনিসপত্র ঠিক আগের মতোই রাখা রয়েছে।

ড্রাইভার মফিজ এসে গেট খুলে দিয়েছে। চাবি হাতে নিয়ে দীর্ঘদিন পর ড্রাইভিংয়ের জন্য প্রস্তুত হলেন ডা. মেহেরুন্নেসা বেগম। তিনি উপলব্ধি করেন, শোক কখনোই জীবনের কোনো অধ্যায় থেকে মুছে যায় না; বরং তা স্মৃতির নীরব সঙ্গী হয়ে ব্যক্তির পাশে প্রতিনিয়ত অবস্থান করে। মানুষ শোকের সাথে সহাবস্থান শিখে ফেলে। ধীর পদক্ষেপে বারান্দা পেরিয়ে তিনি নিচে নামলেন, পথের পরিচিত মানুষগুলো এখনো তাঁকে শ্রদ্ধাভরে সালাম দেয়। তাঁদের কাছে তিনি শুধু মমতাময়ী চিকিৎসকই নন, তাঁনি এক কিংবদন্তিতুল্য মানুষের জীবনসঙ্গিনীও বটে।

সাদা রঙের পুরনো গাড়িটির ইঞ্জিন চালু করতেই শরীরে এক অদ্ভুত অনুভূতি অনুভব করলেন তিনি। এই গাড়িটি স্বামী-স্ত্রীর অনেক স্মৃতির সাক্ষী। ডা. আবু সালেহ কিনেছিলেন অত্যন্ত শখ করে। গাড়িতে বসেও তিনি রোগীদের গল্প করতেন। মিরপুর রোডের সিগন্যালে পৌঁছে তিনি দ্বিধায় পড়লেন, যাবেন উত্তর দিকে, নাকি দক্ষিণে? বোটানিক্যাল গার্ডেন, না রমনা পার্ক? অবশেষে নিজের মনের কথাই অনুসরণ করলেন, 'কোথাও না। আমি যাব বনানীতে! সেখানে শুয়ে আছে আমার সালেহ! তার কবর ছুঁয়ে বলব, তোমাকে খুব বেশি মিস করছি। আমি তোমার মেহেরু! অপেক্ষা করো, শীঘ্রই আমি চলে আসছি তোমার কাছে!' সংসদ ভবনকে বাঁয়ে রেখে ডাক্তার মেহেরুন্নেসা বেগমের গাড়ি তখন ছুটে চলল বনানীর সেই চিরন্তন শেষ গন্তব্যের দিকে।