বিশ্বকাপের মৌসুমে রাত জাগা, কাজের চাপ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং—এসব কারণে আমরা প্রায়ই ঘুমের সঙ্গে আপস করি। ক্লান্তি তাড়াতে সকালে এক মগ কড়া কফি খেলেও শরীরের অভ্যন্তরে যে নীরব ক্ষতি হচ্ছে, তা আমরা টের পাই না। সম্প্রতি ‘অ্যানালস অব ইন্টারনাল মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা এই বাস্তবতার ওপর নতুন আলো ফেলেছে। তাতে উঠে এসেছে, রাতের ঘুম থেকে মাত্র ৯০ মিনিট কমিয়ে দিলে ওজন বাড়তে শুরু করে এবং শরীরে অলসতা ভর করে।

ঘুম ও ওজন বৃদ্ধির সম্পর্ক আগেও গবেষণার বিষয় ছিল, তবে সেসব পরীক্ষা হতো গবেষণাগারের কৃত্রিম পরিবেশে। অংশগ্রহণকারীদের ল্যাবে আটকে রেখে হঠাৎ ঘুম অর্ধেক কমিয়ে দেওয়া হতো, যা বাস্তব জীবনের চিত্র নয়। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি আরভিং মেডিকেল সেন্টারের পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক মেরি-পিয়েরে সেন্ট-অঞ্জ, যিনি এই গবেষণার প্রধান লেখক, জোর দিয়ে বলেছেন, বাস্তবে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৩০ শতাংশই দীর্ঘমেয়াদি মৃদু ঘুমহীনতায় ভোগেন। তাঁরা প্রতিদিন এক থেকে দেড় ঘণ্টা ঘুম কমান, যা মাসের পর মাস চলতে থাকে।

এই গবেষণায় সেই বাস্তব চিত্রই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ল্যাবরেটরির বাইরে। ৯৫ জন স্বাভাবিক ঘুমের (সাত-আট ঘণ্টা) মানুষকে টানা ছয় সপ্তাহ ধরে প্রতিরাতে দেড় ঘণ্টা কম ঘুমাতে দেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা যায়, এতে অংশগ্রহণকারীদের ওজন গড়ে প্রায় ৪৫০ গ্রাম বেড়েছে। শরীরে জমা ক্লান্তির কারণে তারা দৈনিক গড়ে ১৭ মিনিট অতিরিক্ত সময় বসে কাটিয়েছেন। পুরুষ ও মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে উদ্বেগজনক; তাঁরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ মিনিট বেশি নিষ্ক্রিয় ছিলেন।

ছয় সপ্তাহে ৪৫০ গ্রাম ওজন বৃদ্ধিকে সামান্য মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ। কানাডার চিলড্রেনস হসপিটাল অব ইস্টার্ন ওন্টারিওর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী জ্যঁ-ফিলিপ চ্যাপুট, যিনি সরাসরি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, সতর্ক করে বলেছেন, এই ধারা মাসের পর মাস চলতে থাকলে এক-দুই বছর পর ওজন কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা ভাবনার বিষয়। ওজন বাড়া মানে শুধু বাহ্যিক স্থূলতা নয়। অধ্যাপক সেন্ট-অঞ্জের নেতৃত্বে আরেকটি গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, ঘুমের ঘাটতি নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয়। যাঁরা আসীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত, তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি অসুখের ঝুঁকি এমনিতেই বেশি; তার ওপর ঘুমের ঘাটতি অগ্নিতে ঘৃতাহুতির কাজ করে।

ঘুমহীনতার ক্ষতিকর দিক প্রমাণিত হলেও অধ্যাপক সেন্ট-অঞ্জ ভবিষ্যতে ভিন্ন পথে গবেষণা করতে আগ্রহী। তাঁর ভাষ্য, খারাপ অভ্যাসের নেতিবাচক ফল জানা সহজ, কিন্তু এখন দেখা দরকার পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের কী পরিমাণ উন্নতি ঘটাতে পারে। জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভালো কাজ করে তার ইতিবাচক ফল উপভোগ করা। তাই ওয়েব সিরিজ বা অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং বাদ দিয়ে প্রতিদিনের মূল্যবান দেড় ঘণ্টা ঘুম ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।