রাজশাহী নগরের শেখপাড়া এলাকায় সরু রাস্তার ধারে ফরিদুর রহমানের ছোট দোকানটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। বেতের তৈরি চেয়ার, মোড়া, ঝুড়ি ও আয়নার ফ্রেম—থরে থরে সাজানো পণ্যগুলো যেন কালের সাক্ষী। ৭০ বছর আগে এই শহরে পা রেখেছিলেন ফরিদুর; সেই থেকে তিনি বেতশিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বয়স এখন তাঁর ৮০ ছুঁইছুঁই। একসময় সিলেট কাজীবাজার থেকে একদল লোক রাজশাহীতে এসে বেতপট্টি গড়ে তোলেন। সেই দলের একমাত্র জীবিত সদস্য এখন ফরিদুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, বন্যায় বেতের তীব্র সংকট দেখা দিলে তিনি প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে আসবাব তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। করাচি থেকে আনা সে সুতা দিয়ে তৈরি চেয়ার-টেবিল তখন অনেকের কাছেই ছিল অবিশ্বাস্য। কিন্তু সময় তাঁর সেই পরীক্ষাকে সফল প্রমাণ করে; পরে রাজশাহীর আরও ব্যবসায়ী সে পথ অনুসরণ করেন।

শৈশবে মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবা ও ১৫ বছরে মাকে হারানোর পর অসহায় ফরিদুর এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের হাত ধরে রাজশাহীতে আসেন। রাজশাহীর মাটি তাঁর ঠিকানা হয়ে যায়। সেখানেই গড়ে তোলেন সংসার ও ব্যবসা। ধীরে ধীরে তাঁর অধীনে ২০ থেকে ২২ জন কারিগর কাজ করতে শুরু করেন। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছিল একাধিক দোকান। বর্তমানে বেতপট্টি এলাকায় টিকে আছে মাত্র তিনটি দোকান, যার একটি তাঁর। পাশের দোকানিরা জানান, জটিল নকশা ও অভিজ্ঞতার জন্য আজও ফরিদুর রহমানের কাছেই পরামর্শ নিতে আসেন অনেকে। তবে গত বছর স্ট্রোকের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অনেক অবনতি হয়েছে। এখন নিজে কিছু করতে পারেন না, শুধু বসে বসে কারিগরদের কাজ দেখেন, প্রয়োজনে পরামর্শ দেন।

সিলেটের কাজীবাজারের পৈতৃক ভিটের কথা মনে করে ফরিদুর জানান, জমির মূল্য এখন কোটি টাকার বেশি হলেও তিনি সেই অধিকার হারিয়েছেন। আত্মীয়স্বজন ধীরে ধীরে জায়গা দখলে নেয়ায় কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মামলা-মোকদ্দমা করে আর লাভ নেই। কাগজপত্র নেই, সাক্ষী নেই। যা পেয়েছি তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।’ সিলেট যেতেও এখন খরচের বোঝা তাঁকে পিছিয়ে দেয়। পরিবার নিয়ে যেতে খরচ হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, আর তাতে দূরের আত্মীয়দের হাতে কিছু না কিছু তুলে দেওয়ার রেওয়াজও আছে। সবচেয়ে বড় কথা, যে বাড়ির জন্য মন কাঁদত, সেখানে আর অপেক্ষায় কেউ নেই। ‘মানুষ যায় আপন মানুষের টানে। আমার সেই টানটাই নেই,’—বলেন তিনি।

ফরিদুর রহমানের দোকানে প্রতিদিন কিছু না কিছু ক্রেতা আসেন। কেউ আগে বানিয়ে রাখা ঝুড়ি নিতে চান, কেউ আবার নতুন নকশার অর্ডার দিতে চান। সম্প্রতি দুই নারী ক্রেতা এসেছিলেন, যারা ছোট বেতের ঝুড়ির দাম দরকষাকষি করছিলেন। ফরিদুর জানান, অর্ডার অনুযায়ী ঝুড়ি বানাতে কারিগরদের বাড়তি সময় দিতে হয়, তাই দামও কিছুটা বেড়ে যায়। একই দিনে আরও দুই তরুণী একটি নতুন নকশার ছবি দেখিয়ে একই রকম পণ্য তৈরি করতে বললেন। কিন্তু ফরিদুর মৃদু হেসে জানান, বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা এখন আর সেই কাজের অনুকূলে নেই। তিনি পাশের দোকানে যেতে ইঙ্গিত করেন।

উত্তরসূরি তৈরি করতে না পারার আক্ষেপ গভীর ফরিদুরের। তাঁর ছেলেরা কেউ এই পেশায় আগ্রহ দেখায়নি। শুধু মালিকানার চেয়ে দায়িত্ববোধকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে তিনি এখনো পুরোপুরি দোকান তাদের হাতে তুলে দিতে পারেননি। একসময় যাঁর হাতে গড়া নকশা রাজশাহীর বেতশিল্পে নতুন দিশা দেখিয়েছিল, সেই হাত এখন কাঁপে বয়সের ভারে। মহামারি, প্লাস্টিক ও স্টিলের আসবাবের দাপটে চাহিদা কমেছে বেতের তৈরি জিনিসের। তবু প্রতিদিন তিনি দোকানে আসেন, যেন এই শিল্পের স্মৃতিগুলোকে পাহারা দেন। ‘আগের মতো বিশ্বস্ত কারিগর নেই,’—আক্ষেপ করে বলেন ফরিদুর। তাঁর পর সম্ভবত দোকানের দরজা একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ, একটি শিল্প টিকে থাকে শুধু কারিগরে নয়, প্রয়োজন উত্তরসূরি আর দায়িত্ববোধ—যা কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে।