নব্বই দশকের নস্টালজিয়ায় ডুবে থাকা একজন মানুষ এখনো ঢাকার পথে-ঘাটে ছেলেবেলার টুকরো স্মৃতি খুঁজে বেড়ান। গ্রামের ছোট্ট ইছামতী, মাঠ, জঙ্গল আর পাখিরা তাকে পিছু ডাকে। মাঝে মাঝেই থমকে দাঁড়িয়ে তিনি হারিয়ে যান সেই রঙিন ছেলেবেলায়, যখন দুঃখ-অভাব ছিল না, অল্পতেই তুষ্ট থাকা যেত। মাঠের পানি খাল বেয়ে নদীতে নামা, পাখির ডাক, এমনকি টাকার নোটের ছবিও ছিল তার কাছে বিস্ময়ের। সেই সময় কাগুজে টাকার আটটি নোট ছিল—এক, দুই, পাঁচ, দশ, বিশ, পঞ্চাশ, একশ ও পাঁচশ টাকা। সবগুলোই সুন্দর, তবে সবচেয়ে প্রিয় ছিল দুটাকার নোটটি। একটি সাদা-কালো পাখি চিকন ডালে লেজ উঁচু করে এমন ভঙ্গিতে বসে ছিল, যেন মুহূর্তেই উড়ে যাবে। সেই সময় দুটাকা ছিল অনেক টাকা; স্কুলের টিফিনের জন্য মা চার আনা দিতেন, যা দিনেই শেষ হয়ে যেত। তাই দুটাকা হাতে পেলে তিনি তন্ময় হয়ে সেই পাখিটি দেখতেন। বহু বছর পর শুনেছেন, দুটাকার নোটটি বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর নোট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে—কিন্তু এটি ছিল গুজব। এমন কোনো স্বীকৃতি আসলে দুটাকার নোট পায়নি। তবুও তার কাছে এটি বিশ্বের সেরা নোট। নোটের পাখিটি আসলে বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল। দোয়েলের ডাক ভারি মিষ্টি; টুইট টুইট করে লম্বা শিস দেয়, যা একবার শুনলে মনে গেঁথে যায়। সাদা-কালো এই পাখিটি হাটে, মাঠে, ঘাটে এমনকি শহরেও সহজে দেখা যায়। অতি পরিচিত পাখি হলেও বাংলাদেশের প্রতিটি সাদা-কালো পাখিই অনেক রঙিন পাখির চেয়ে সুন্দর লাগে। তবে একটি অপূর্ণতা ছিল—১১ বছর ধরে পাখির ছবি তুললেও দোয়েলের ছবি তোলা হয়নি। ঘরের খুব কাছে পাওয়া যায় বলে হয়তো তোলা হয়নি। এবার গ্রীষ্ম ও বর্ষা মিলিয়ে পুরো সময় গ্রামের বাড়িতে কাটাচ্ছেন তিনি। মাঝেমধ্যে ছবি তুলতে বের হন; পাখি, বন্য প্রাণী, ফুল—যা চোখে পড়ে, ক্লিক করে রাখেন। বাড়ির পাশের একটি পরিত্যক্ত জমিতে ঝোপঝাড়ের মধ্যে ছোট-বড় পিটুলিগাছ রয়েছে। একদিন সেখানে ছবি তুলতে গিয়ে বড় পিটুলিগাছে একটি ফটিকজল পাখি দেখতে পান, বাসা বাঁধার জন্য খড়কুটো জড়ো করছে। ছবি তোলার সময় ছোট্ট একটি পিটুলিগাছের ডালে একটি দোয়েল নেচে বেড়াচ্ছে। মস্তিষ্ক তখন মনে করিয়ে দেয়, দোয়েলের ভালো ছবি নেই। হাতে ছিল ৬০০ মিলিমিটারের টেলিফটো লেন্স; একের পর এক ক্লিক করে চলেন। তখনই মনে হয়, দুটাকার নোটের দোয়েলের মতো পোজে ছবি তোলা যায় কি না! ক্যামেরার শাটার বাটন চেপে ধরে সেকেন্ডে ৭টি ছবি তোলার চেষ্টা করেন, কিন্তু দোয়েলের ভঙ্গি বদলের গতি এর চেয়েও দ্রুত। তবুও চেষ্টা চালিয়ে যান; কিছু ছবি টাকার ছবির সঙ্গে মিলে গেছে বলে মনে হয়। তবে কাছে দুটাকার নোট না থাকায় পাই টু পাই মিল হয়েছে কি না তা বুঝে ওঠা যায়নি। পরে ছবি আর নোট মিলিয়ে দেখেন—কোনো ছবিই হুবহু মেলেনি, তবে পোজের কাছাকাছি কিছু হয়েছে, এতেই তিনি সন্তুষ্ট। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের দুটাকার সেই নোটটি প্রথম বাজারে আসে ১৯৮৬ সালে, যার নকশা করেন বাংলাদেশ টাঁকশালের সাবেক মহাব্যবস্থাপক, খোদাইশিল্পী ও ছাপচিত্রী মুছলিম মিয়া।