নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরে মাছিমদিয়া গ্রামে অবস্থিত শিল্পী এস এম সুলতানের পরিত্যক্ত বাড়িটি আজও ইতিহাসের সাক্ষী। তিনটি ভিন্ন ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পীর জীবন পর্ব তিনটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে ভরা। প্রথম পর্বে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েও কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়া, এরপর তিন বছর সেখান থেকে পালিয়ে ভারতের নানা শহরে ভবঘুরের জীবন যাপন—সবকিছু মিলিয়ে তিনি নিজের একটি আলাদা জগৎ নির্মাণ করেন। চল্লিশের দশকের শুরুর দিকের তাঁর সব শিল্পকর্ম সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অবগত নই, তবে জীবিকার তাগিদে নানা কাজ করতে হয়েছে বলেই জানা যায়। পূর্বসূরিদের অনুসরণ না করে তিনি ঔপনিবেশিক শিল্পরীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন এবং গ্রামীণ জীবন থেকে উঠে আসা বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দেন।

ভারত ভাগের পর সুলতানের জীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্তানে, যেখানে তিনি শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। পঞ্চাশের দশকে আমেরিকা ও ইউরোপ ভ্রমণ তাঁর শিল্পভাবনাকে আরও গভীর করে। পশ্চিমা শিল্পীদের কাজ কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণে সহায়তা করে। প্রচলিত শিল্পকলার ব্যাকরণ ভেঙে তিনি মাটির মানুষের কৃষিসভ্যতাকে তাঁর সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেন, যা তাঁকে এনে দেয় তুমুল সাফল্য। এভাবেই শুরু হয় তাঁর জীবনের তৃতীয় ও সবচেয়ে সৃজনশীল অধ্যায়—যেখানে হাজার বছরের কৃষিসভ্যতার চিত্র তিনি ক্যানভাসে জীবন্ত করে তোলেন।

মাছিমদিয়ার সেই বাড়িতে ১৯৭৮ সালের নভেম্বরে প্রথম প্রবেশ করে বিস্মিত হয়েছিলেন এই লেখক। রাজধানীতে বেড়ে ওঠা মানুষের কাছে অকল্পনীয় ছিল একটি জরাজীর্ণ দোতলা ভবনে এমন এক খ্যাতিমান শিল্পীর বসবাস। দেয়ালে পাটের দড়িতে টাঙানো ধূসর কাপড়, মাঝখানে দুটি আয়ত চোখ আর বিবর্ণ নারীর মুখ। কোনো আসবাব নেই, নেই বেডরুম, স্টুডিও বা রান্নাঘর। বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহও নেই। প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো জমিদারবাড়ির বিচ্ছিন্ন অংশটি এতটাই ভঙ্গুর যে যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে।

প্রথম রাতেই লেখক আবিষ্কার করেন, সুলতানের সঙ্গে ওই বাড়িতে বসবাস করে কয়েক শ প্রাণী—বড় টিকটিকি, ধাড়ি ইঁদুর, দেড় ডজন বিড়াল, কুকুর, পাখি এবং একটি বড় বনমোরগ। মধ্যরাতে প্রাণীদের কণ্ঠস্বর থেমে যায়, ঘরে ঢোকেন সুলতান। লেখক ঘুমের ভান করে দেখেন, শিল্পী একে একে খাঁচার প্রাণীদের সঙ্গে কথা বলছেন, আর তাঁরাও যেন বিভিন্ন শব্দে সাড়া দিচ্ছে। সুলতান তাদের সাংকেতিক ভাষা বুঝতে পারেন বলে মনে হচ্ছিল। বের হওয়ার সময় তিনি প্রাণীদের উদ্দেশে বলেন, আজ অভুক্ত থাকতে হবে, কারণ ঢাকা থেকে মেহমান এসেছেন, তাঁকে ডিস্টার্ব করা চলবে না। লেখকের চোখে ধরা পড়ে প্রাণীগুলোর প্রতি তাঁর মায়া ও ভালোবাসার গভীরতা।

পরের বছর ডিসেম্বরে আবার সেখানে গিয়ে লেখক দেখেন সেই একই জরাজীর্ণ চিত্র। তবে এবার তিনি আরও ঘনিষ্ঠভাবে সুলতানের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে পরিচিত হন। সকালে সুলতান দুই ব্যাগ বাজার নিয়ে ফিরে খোলা বারান্দায় ঢেলে দেন পাতা ও ফুলকপির ডাঁটা—যেগুলো সাধারণত বিক্রি হয় না। মাটিতে বসে তিনি সেগুলো কুচি কুচি করে কেটে প্রাণীদের খেতে দেন, আর তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে নিচু ও শান্ত।

সুলতান লেখককে নিচতলায় নিয়ে যান, যেখানে ৪ ফুট বাই ৮ ফুটের মতো বড় ক্যানভাসগুলো রয়ে গেছে। বিরূপ আবহাওয়া ও উইপোকার কারণে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ১৯৭৬ সালের বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রদর্শনীর বিক্রি না হওয়া ছবিও রয়েছে। 'চর দখল' শিল্পকর্মটি বের করে এলে দেখা যায় সেখানে ফুটা হয়ে গেছে। সাদা-কালো ফিল্মে সেই আইকনিক শিল্পকর্মের দৃশ্য ধরে রাখেন লেখক। সেই সময় মনে হচ্ছিল ক্যানভাসের পেশিবহুল মানুষেরা যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে, আর সুলতান পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন।

দুপুরে চিত্রা নদীতে গোসল করার পরিকল্পনা হলেও সুলতান জানান, ছবি টেনে বের করতে গিয়ে হাত ব্যথা পেয়েছে, তাই বালতিতে পানি ঢেলে বারান্দায়ই গোসল সেরে নেবেন। লেখক নদীতে নামেন, কিন্তু স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারেন সুন্দরবন থেকে মাঝেমধ্যে কুমির এদিকে আসে, তাই তিনি দ্রুত উঠে আসেন। দুপুরের খাবারের সময় ফুলআঁকা টিনের থালায় ভাত, পাতলা ডাল ও শাকের ভাজি খেতে বসলে বিড়ালগুলো সাবধানে প্লেটের সামনে চলে আসে। সুলতান তাদের বলেন, আজ খাওয়া হলো না, কালকে দেবেন। লেখক সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন—ক্ষুধার্ত বিড়াল ও মানুষের এক মায়াবী ইতিবৃত্ত।

আজ কয়েক দশক পর সেই ছবি শুধু একজন বিশ্বমানের শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের স্মারক নয়, বরং শিল্পী ও আলোকচিত্রী—দুই সৃষ্টিশীল মনের দীর্ঘ সহযাত্রার বিরল সাক্ষ্য হিসেবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।