দেশের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পাবলিক পরীক্ষার মধ্যে একটি এসএসসি। প্রতিবছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। সবাই যে কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট — প্রতি বছর এইচএসসিতে পাসের হার ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ হলেও জিপিএ–৫ পাওয়ার সংখ্যা দেড় লাখের ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ বিশাল একটি অংশ এ প্লাসের বাইরে থেকে যায়। অথচ এ প্লাসই কি এখন শিক্ষার্থীর একমাত্র সফলতা? অনেক অভিভাবক মনে করেন তাই, কিন্তু এই ধারণাই শিক্ষার্থীদের জন্য বিষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য ব্যবধানে এ প্লাস না পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী ভেঙে পড়ে, দুশ্চিন্তায় নিজেকে ঘিরে ফেলে এবং কেউ কেউ চরম সিদ্ধান্তও নিয়ে বসে।

আজ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ। এই দিনে পরীক্ষার্থী সন্তানের মা-বাবার আচরণ সরাসরি প্রভাব ফেলে তার মানসিক অবস্থার ওপর। সাফল্যে গর্ব করা স্বাভাবিক, কিন্তু ব্যর্থতায় ধৈর্য হারানো বা রাগ দেখানো সন্তানের আত্মবিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ডিজিটাল যুগে ফল মোবাইল ফোনেই এসে যায়, ফলে অনেক অভিভাবক খারাপ ফল দেখেই সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের ওপর চড়াও হন। খারাপ ফলের ব্যাখ্যা চাওয়া, বকাঝকা করা বা কটূক্তি করার প্রবণতা দেখা যায়। এই সময়টায় সন্তানের মানসিক অবস্থা সবচেয়ে নাজুক থাকে — সে নিজেও হতাশ, ভীত। ঠিক তখনই অভিভাবকের রাগ বা দোষারোপ তাকে ভেতর থেকে আরও ভেঙে দেয়। এই মুহূর্তে দরকার সহানুভূতি ও বোঝাপড়া; পাশে বসে শান্তভাবে কথা বলা এবং 'সব ঠিক হয়ে যাবে' — এমন আশ্বাসই তার ভয় কমাতে পারে। ফল তাৎক্ষণিক বদলানো সম্ভব না হলেও, আচরণের মাধ্যমে সন্তানের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

অনেক পরিবারে 'পাশের বাসার অমুক এ প্লাস পেল, তুই পেলি না কেন?' — এই ধরনের তুলনা করার প্রবণতা প্রচলিত। কিন্তু এমন তুলনা সন্তানের আত্মসম্মানকে গভীরভাবে আঘাত করে। নিজেকে অযোগ্য ভাবতে শুরু করে সে, মনে হয় তার সব পরিশ্রম বৃথা গেল। এর ফলে জন্ম নিতে পারে হীনম্মন্যতা, মানসিক অবসাদ এবং পড়াশোনার প্রতি অনীহা। তুলনা না করে সন্তানের নিজের অগ্রগতির দিকে নজর দেওয়া উচিত — সে কোথায় ভালো করেছে, কোথায় উন্নতির সুযোগ আছে — তা নিয়ে আলোচনা করে আশ্বস্ত করা।

খারাপ ফলাফলের পর অনেক মা-বাবা হতাশাসূচক কথা বলেন। 'তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না', 'তুই আমাদের বোঝা' — এমন মন্তব্য সন্তানের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। মা-বাবার কাছে নিজের কোনো মূল্য নেই — এই ধারণা বদ্ধমূল হলে সে নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। ভয়, অপরাধবোধ বা আত্মঘৃণা থেকে জন্ম নেওয়া এই মানসিক অবস্থা শুধু পড়াশোনায় নয়, ভবিষ্যতের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে রাগ বা হতাশার বদলে বোঝানো দরকার যে, একটা খারাপ ফল জীবনের শেষ নয়; পরের ধাপে ভালো করার সুযোগ রয়েছে। অভিভাবকের উৎসাহই পরবর্তী সফলতার প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।

অনেক শিক্ষার্থী এসএসসির পরে নিজের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে অভিভাবকেরা সন্তানকে তিরস্কার করে একা ছেড়ে দেন। কিন্তু এ সময় বরং আরও বেশি সহযোগিতার প্রয়োজন। বিকল্প পথ সম্পর্কে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করা উচিত, যাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সে নিজের জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পাশাপাশি, খারাপ ফলের পর অনেক অভিভাবক সন্তানের সব আনন্দের মাধ্যম বন্ধ করে দেন — মোবাইল কেড়ে নেওয়া, টিভি দেখা বন্ধ করা বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে নিষেধ করা। এমন বিধিনিষেধ সন্তানকে আরও হতাশ ও নিঃসঙ্গ করে তোলে। তাকে কিছুটা সময় এবং মন হালকা করার সুযোগ দেওয়া জরুরি। ফল যাই হোক, সেটাকে উদযাপন করলে সন্তান মানসিকভাবে স্থিতিশীল হয়ে পরের ধাপের জন্য প্রস্তুত হতে পারবে।

এসএসসির ফলাফল জীবনের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, পুরো জীবন নয়। একটি খারাপ ফল কখনো সন্তানের সামর্থ্য বা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। মা-বাবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সন্তানের পাশে থাকা, তার প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর সাহস দেওয়া। একটু সহানুভূতি, বোঝাপড়া ও ইতিবাচক মনোভাব সন্তানের ভেতরের হতাশা দূর করতে পারে। আজ ব্যর্থ সন্তানটিই আগামীকাল হয়তো ভিন্নভাবে সফলতার গল্প লিখবে — যদি সে পায় অভিভাবকের ভালোবাসা ও সমর্থন।