ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) অ্যাডভান্সড কনসেপ্ট টিমের সঙ্গে কাজ করা ডিজাইনার জর্জ মানেস রুবিও চাঁদে একটি অভাবনীয় ‘মুন টেম্পল’ নির্মাণের পরিকল্পনা পেশ করেছেন। এই মহাজাগতিক দুর্গটি হবে ‘মুন বেস আলফা’-র কেন্দ্রস্থল এবং ক্রমবর্ধমান মহাকাশ সভ্যতার এক আভাস্বর স্তম্ভ। রুবিও জানান, প্রাচীন সভ্যতার মন্দিরগুলো যেভাবে মানমন্দির হিসেবেও কাজ করত, এই মন্দিরেও তরল দর্পণসহ এক মানমন্দির থাকবে।

রুবিওর ভাষায়, প্রথম মহাকাশ প্রতিযোগিতা ছিল পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, কিন্তু বর্তমানে যেভাবে বিভিন্ন জাতীয় মহাকাশ সংস্থা ও স্বাধীন উদ্যোক্তারা চাঁদে পৌঁছানোর লক্ষ্য স্থির করছে, তা একটি ‘ইউটোপিয়া’ সৃষ্টির সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি আশা করছেন, এই মন্দিরে বিশ্বের নানা প্রান্তের নভোচারীরা একত্র হয়ে এথেন্সের নাগরিকদের মতো একটি নতুন মহাকাশ-সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারবে।

এই মন্দিরের নকশার পেছনে অনুপ্রেরণা ছিলেন ইসার সাবেক মহাপরিচালক ইয়ান ভোর্নার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নভোচারীদের নিয়ে একটি ‘মুন ভিলেজ’ গড়ে তোলার যে ভাবনা তিনি প্রচার করেছিলেন, সেটিই রুবিওকে অনুপ্রাণিত করে। এই গ্রাম কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রদর্শনীই হবে না, বরং তা একটি মডেল মহাকাশ সমাজ হয়ে পৃথিবীতেও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বয়ে আনতে পারে।

রুবিওর নকশা করা গম্বুজাকৃতির স্থাপনাটি পৃথিবীতে নির্মাণ করা অসম্ভব, কারণ এটি নিজের ওজনে ভেঙে পড়বে। কিন্তু চাঁদে যেখানে ভূপৃষ্ঠের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ, সেখানে এটি শতাব্দী ধরে টিকে থাকতে পারবে। মন্দিরটির একটি বিশাল খিলানাকার চোখ (অকুলাস) থাকবে, যা দিগন্তের দিকে মুখ করে থাকবে। এই স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর পৃথিবীকে দিগন্তরেখায় ভেসে যেতে দেখা যাবে এবং পরে তা নক্ষত্রখচিত আকাশের পটভূমিতে মিলিয়ে যাবে। এই ধারণা মার্কিন শিল্পী জেমস টুরেলের ‘স্কাইস্পেস’-এর মত, যেখানে একটি আকাশমুখী জানালা নক্ষত্রমণ্ডলের সাথে সংযোগ তৈরি করে। রিবোর মতে, পুরো পৃথিবী ও পরে ছায়াপথ মিলে হয়ে উঠবে শিল্পকর্মের অংশ, যা মানবতার উৎস ও ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করবে।

অপরদিকে, নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজাকম্যান ২০২৮ সালে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে প্রথম নভোচারী অবতরণের পরিকল্পনা করেছেন। এর এক বছর পর তারা একটি কার্যক্ষম ঘাঁটি ও বাসস্থান গড়ে তোলার কাজ শুরু করবে। আইজাকম্যান মনে করেন, দ্বিতীয় মহাকাশ প্রতিযোগিতা বিশ্বব্যাপী মানব অগ্রগতির গতিপথ কীভাবে বদলে দেবে তা অনুমান করা কঠিন হলেও তিনি আশাবাদী যে এর প্রভাব হবে একটি ‘আরও ঐক্যবদ্ধ সভ্যতা’। নাসা যখন আর্টেমিস অ্যাকর্ডসের অধীনে ৭০টি দেশের জোট তৈরি করে চাঁদে আন্তর্জাতিক মানব মহাকাশ অন্বেষণ কর্মসূচির বিস্তৃত রূপ দিচ্ছে, তখন রিবোর এই মুন টেম্পল সেই অভিন্ন ভবিষ্যতেরই প্রতীক হিসেবে গণ্য হতে পারে।

তবে একটি বৈশ্বিক মহাকাশ সংস্কৃতি তৈরির ধারণা পূর্ণতা পেতে সময় লাগবে বলে মত রিবোর। এটি একটি বৈশ্বিক আন্দোলনে পরিণত হবে। এদিকে ইসা তাদের ওয়েবসাইটে মুন টেম্পলের একটি ভার্চুয়াল প্রদর্শনী আয়োজন করলেও কবে এটি বাস্তবে নির্মিত হবে, তা নিশ্চিত করেনি। রিবো একটি ভিআর সংস্করণও নির্মাণ করছেন, যা বিশ্বের তরুণ প্রযুক্তি-উৎসাহীরা হেডসেট পরে ব্যবহার করতে পারবে। এছাড়া আমস্টার্ডামের মিউজিয়াম হেট শিপ আসন্ন ‘ব্রাইট নিউ ওয়ার্ল্ড’ প্রদর্শনীতে এই কল্পিত স্বর্গের নকশা উন্মোচন করবে।