রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান নগরকেন্দ্রগুলোতে পাখিদের অস্তিত্ব ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। যানজট, উঁচু কংক্রিটের দেয়াল, দালানকোঠা ও নিরন্তর জনস্রোতের এই শহরে একসময় ভোর হতো পাখির কলকাকলিতে, কিন্তু আজ সেই শব্দ অনেকখানি স্তিমিত। দোয়েল, শালিক, কাক, ফিঙে, কবুতর, ঘুঘু ও টুনটুনির মতো পরিচিত প্রজাতিগুলো এখনো টিকে থাকলেও বিশেষ করে চড়ুই পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। নগরবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আধুনিক স্থাপত্যরীতি, কাচের ব্যাপক ব্যবহার, গাছপালা উধাও হয়ে যাওয়া এবং খাদ্যের অভাব ছোট পাখিদের আবাসস্থল ধ্বংস করে ফেলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এ বাস্তবতাকে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট করেছে। অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণা বাংলাদেশের পাঁচটি বৃহৎ শহর—ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে কীভাবে ধাপে ধাপে নগরায়ণ পাখির প্রজাতিগত বৈচিত্র্যকে বদলে দিচ্ছে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ারের জার্নাল গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন-এ ২০২৫ সালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এতে মোট ৩১ হাজার ৬০১টি পাখি নথিভুক্ত করা হয়েছে, যা ১৯টি বর্গ, ৬০টি পরিবার ও ২৩৮টি প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত—বাংলাদেশের মোট পাখি প্রজাতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
গবেষণার ফলাফলে স্পষ্ট, নগরায়ণের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখির প্রজাতির সংখ্যা কমতে থাকে। উচ্চমাত্রার নগরায়িত এলাকায় মাত্র ১৩৬টি প্রজাতি রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে মাঝারি ও নিম্ন নগরায়িত এলাকায় এ সংখ্যা যথাক্রমে ১৮৫টি ও ১৮৩টি। বড় গাছ নিধন, জলাশয় ভরাট ও খোলা জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ায় পাখিদের খাদ্য, বাসা বাঁধার স্থান ও নিরাপদ আশ্রয় একইসঙ্গে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
শহরের ভেতরের অংশে পাখির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য সবচেয়ে কম; প্রান্তিক এলাকায়, যেখানে এখনো কিছু সবুজ ও জলাভূমি বিদ্যমান, সেখানে পাখির উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। জলাশয়ের গুরুত্ব এ গবেষণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে—পুকুর, লেক বা খালসমৃদ্ধ এলাকাগুলোতে পাখিদের কার্যকরী বৈচিত্র্য বেশি, কারণ এসব স্থান শুধু পানির উৎস নয়, খাদ্য, আশ্রয় ও প্রজননের জায়গা হিসেবেও কাজ করে। অন্যদিকে কৃষিজমিতে একঘেয়ে চাষাবাদ ও রাসায়নিক ব্যবহারের দরুন পাখির বৈচিত্র্য কম পাওয়া গেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বায়ুদূষণ পাখিদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। সূক্ষ্ম ধূলিকণা পাখির শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি করে, প্রজনন ব্যাহত করে এবং খাদ্য খোঁজার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। দূষিত এলাকায় পোকামাকড়ও হ্রাস পায়, যা অনেক পাখির প্রধান খাদ্য।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গবেষণাটি পাখিদের বিবর্তনগত বৈচিত্র্যের ওপরও আলোকপাত করেছে। শহরের কেন্দ্রে এখন এমন পাখিরাই বেশি টিকে আছে যারা আত্মীয়তার সূত্রে কাছাকাছি। তবে পাখিদের কার্যগত বৈচিত্র্যে বড় কোনো পরিবর্তন ধরা পড়েনি—টিকে থাকা প্রজাতিগুলো প্রায় একই ধরনের পরিবেশগত কাজ (যেমন পোকা খাওয়া, বীজ ছড়ানো, ময়লা পরিষ্কার) করে চলেছে। গবেষকরা সতর্ক করছেন, এই স্থিতিশীলতার আড়ালে বড় ঝুঁকি লুকিয়ে আছে; যখন মাত্র কয়েকটি সাধারণ প্রজাতি কোনো বাস্তুতন্ত্রের ভার বহন করে, তখন যেকোনো বড় পরিবেশগত ধাক্কায় পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়তে পারে।
গবেষণায় কিছু পাখিকে নগর পরিবেশের জীবন্ত সূচক হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে—তাদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি দিয়ে শহরের পরিবেশগত স্বাস্থ্য পরিমাপ করা সম্ভব।
এমন পরিস্থিতিতে পাখি ও প্রকৃতি রক্ষায় নগর–পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জলাশয় সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবন, পার্ক ও ছাদবাগানের মাধ্যমে সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ কমানো, এবং নির্মাণ ও শিল্পকারখানা পরিচালনায় পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি শহরের সবুজ করিডর ও জলাভূমিগুলোকে সংযুক্ত করে পাখির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, নগরায়ণ অনিবার্য হলেও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে কংক্রিটের শহরেও পাখির কিচিরমিচির টিকিয়ে রাখা সম্ভব এবং একইসঙ্গে মানুষের জীবনমানও উন্নত হবে।



