নিউইয়র্কের বিখ্যাত নিলামঘর সোথবিসে ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত এক নিলামে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও অক্ষত টি-রেক্স জীবাশ্মটি রেকর্ড দামে বিক্রি হয়েছে। গাস নামের এই জীবাশ্মটির দাম উঠেছে ৫০.১ মিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ৫ কোটি ১০ লাখ ডলারের সমতুল্য। ফোনে বিড করা এক অজ্ঞাত ক্রেতা এটি কিনে নেন। এর আগে ২০২৪ সালে এপেক্স নামের একটি স্টেগোসরাসের কঙ্কাল প্রায় সাড়ে চার কোটি ডলারে বিক্রি হয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল, কিন্তু সেই রেকর্ড এখন ভেঙে গেল।
প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ বছরের পুরোনো এই জীবাশ্মটির আকার ৩ দশমিক ৮ মিটার বা প্রায় সাড়ে ১২ ফুট উঁচু। হাড়ের গঠন বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে এটি একটি পূর্ণবয়স্ক ও শক্তিশালী ডাইনোসর ছিল। ২০২১ সাল থেকে টানা তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার হার্ডিং কাউন্টির একটি খামারবাড়িতে খননকাজ চালিয়ে এটি উদ্ধার করা হয়। থেরোপোডা এক্সপেডিশনস নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান জমির মালিক গ্যারি গাস লিকিংয়ের অনুমতি নিয়ে এই খননকাজ পরিচালনা করে। মজার বিষয় হলো, খননকারী দলের সদস্য কোল জ্যাকবস প্রথম দিনেই খামারের রাস্তা থেকে মাটির ওপরে ভেসে থাকা একটি হাড়ের টুকরা দেখতে পান, যা ছিল ডাইনোসরটির পায়ের পাতার হাড়। গাস নামটি জমির মালিকের সম্মানে রাখা হয়েছে, যিনি খননকাজ শেষ হওয়ার আগেই মারা যান।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ অধ্যাপক রিচার্ড বাটলার এই নিলাম প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, নিলামঘরগুলো ডাইনোসরের কঙ্কালকে চিত্রকর্ম বা বিলাসবহুল জিনিসের মতো চড়া দামে বিক্রি করছে, আর ধনী ব্যক্তিরা সেগুলো নিজেদের আভিজাত্য প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর ফলে সরকারি জাদুঘরে না থাকায় বিজ্ঞানীরা গবেষণার সুযোগ পান না, যা বিজ্ঞানের বড় ক্ষতি করে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত জমিতে পাওয়া জিনিসের ওপর মালিকের সম্পূর্ণ অধিকার থাকে, তাই এই নিলাম আইনি নিয়ম মেনেই হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিরল জীবাশ্মের বাণিজ্যিক কেনাবেচা আইন করে বন্ধ করা উচিত এবং সেগুলো কেবল গবেষণা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে থাকা উচিত।
১৯৯৭ সালে শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়াম ৮০ লাখ ডলারে প্রথম নিলামে বিক্রি হওয়া টি-রেক্স জীবাশ্ম সু কিনে নিয়েছিল বিভিন্ন ধনী ব্যক্তি ও ম্যাকডোনাল্ডসের আর্থিক সহায়তায়। এরপর থেকে ডাইনোসরের জীবাশ্ম সংগ্রহ হলিউড তারকা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও-সহ বড় ধনকুবেরদের শখে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জীবাশ্মের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না বলে মালিক যেকোনো মুহূর্তে জাদুঘর থেকে নিজের বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে পারেন। এতে গবেষণার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নালগুলো এখন কেবল সরকারি জাদুঘর বা স্থায়ী সংগ্রহশালায় থাকা জীবাশ্মের ওপর গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। অন্যদিকে, নিলাম বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দেন যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে না এলে অনেক জীবাশ্ম মাটির নিচেই চাপা পড়ে থাকত, আর এত দাম মূলত উদ্ধারের কঠিন পরিশ্রম ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই হয়ে থাকে।

