ভোলা জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও অমাবস্যার প্রভাবে সৃষ্ট উচ্চ জোয়ারে ব্যাপক প্লাবন দেখা দিয়েছে। দখিনা বাতাসের কারণে জোয়ারের পানি আরও বেড়ে যাওয়ায় দিনে দুবার করে প্লাবিত হচ্ছে জেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ৭৪টি চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ। পানিতে ডুবে গেছে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, মাছের ঘের, কৃষিজমি ও সড়ক। অনেক পরিবার তাদের টিনের চাল বা ঘরের মাচায় উঠে আশ্রয় নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার রাজাপুর, কাচিয়া, ভেলুমিয়া ও ভেদুরিয়া ইউনিয়নের কিছু অংশ; দৌলতখান উপজেলার মদনপুর, মেদুয়া, ভবানীপুর ও হাজিপুর; তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর, মলংচরা ও চাঁদপুর; মনপুরা উপজেলার কলাতলী, মনপুরা, হাজিরহাট, উত্তর ও দক্ষিণ সাকুচিয়া; লালমোহন উপজেলার পশ্চিম চর উমেদ এবং চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর, কুকরিমুকরি ও মুজিবনগর ইউনিয়নের ৭৪টি চর ও বাঁধের বাইরের নিম্নাঞ্চল গত মঙ্গলবার রাত থেকেই জোয়ারের পানিতে নিমজ্জিত। পাউবো জানিয়েছে, আগামী রোববার পর্যন্ত এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। ভোলা পাউবো–১–এর নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়া উদ্দিন আরিফ জানান, আজ শুক্রবার বিকেল চারটায় দৌলতখানের মেঘনা নদীতে জোয়ারের উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ৩ দশমিক ৩৬ মিটার, যা বিপৎসীমা ২ দশমিক ৯৫ মিটারের ওপরে। সন্ধ্যার দিকে এই উচ্চতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাউবো ডিভিশন–২–এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার জোয়ার বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং আগামী শনি ও রোববার পর্যন্ত উচ্চতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারপর পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোলার মনপুরা উপজেলার রামনেওয়াজ এলাকায় জোয়ারের কারণে ইলিশা ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটে যাত্রী ও পণ্যবাহী চালকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ইলিশা ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাট এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যাত্রীরা পানির মধ্যে হেঁটে বা নৌকায় চড়ে লঞ্চে উঠছেন। ফেরিতে যানবাহন ওঠানামাও ব্যাহত হচ্ছে। ইলিশা ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক কাওসার আহমেদ জানান, উচ্চ জোয়ারের কারণে ভোলার ইলিশা ও লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট ফেরিঘাটে ফেরিতে গাড়ি ওঠানামা বন্ধ থাকায় পণ্যবাহী যানবাহনের চালকেরা মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন।
ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চর মোহাম্মদে পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা চর মোহাম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁরা জানান, নারী ও শিশুরা ঘরের মাচার ওপর অবস্থান করছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। সদরের কন্দ্রকপুর ও দক্ষিণ রাজাপুর এলাকায় পানির কারণে আমন ধানের বীজতলা, আধা পাকা আউশ ধান, লাউখেত, সবজিখেত ও মাছের পুকুর ডুবে গেছে। রাস্তাঘাটও তলিয়ে গেছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান বলেন, টানা বৃষ্টি ও উচ্চ জোয়ারের পানিতে আমনের বীজতলা, সবজি ও পানের ক্ষতি হতে পারে।
দৌলতখানের মেঘনার মধ্যে জেগে ওঠা মদনপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম চৌকিদার ও ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন সিকদার জানান, জোয়ারের পানিতে রাস্তাঘাট প্লাবিত হওয়ায় জমিতে ধান চাষ ব্যাহত হচ্ছে। খেতখামারের কাজ বন্ধ থাকায় কর্মসংস্থান কমে গেছে এবং গবাদিপশুর জন্য ঘাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। মনপুরা উপজেলায় চরম দুর্ভোগের খবর পাওয়া গেছে। কলাতলী ইউনিয়নের মনির বাজারের পল্লিচিকিৎসক মো. আল আমিন মুঠোফোনে জানান, দখিনা প্রবল বাতাসে জোয়ারের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় কলাতলী ইউনিয়নের কলাতলী ও কাজীর চর মৌজা মঙ্গলবার রাত থেকেই প্লাবিত। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, টানা বৃষ্টির পর উচ্চ জোয়ারে হাটবাজার, স্কুলের মাঠ, মাছঘাট, খেয়াঘাট, আমনের খেত ও বসতবাড়ি তলিয়ে গেছে। শিশুরা পানির মধ্যে স্কুলে যাতায়াত ও খেলাধুলা করায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে পড়ছে।
মনপুরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব পাশের আশ্রয়ণ প্রকল্পে শতাধিক ঘর প্লাবিত হয়েছে। বুকসমান পানির মধ্যে অনেকে ঘরের টিনের চালে আশ্রয় নিয়েছেন। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেক পরিবার উঁচু রাস্তা, ভবন ও অন্যান্য স্থানে চলে যাচ্ছে। মনপুরার ষাট কলোনির বাসিন্দা মো. ইয়াছিন, মো. কামাল ও সখিনা বিবিসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, দিন ও রাতে দুই দফা জোয়ারের পানিতে তাঁদের এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। রাতের জোয়ারে পরিবারের সবাইকে ঘরের টিনের চালে আশ্রয় নিতে হয়। কখন জোয়ার আসবে, কখন নামবে—এই অপেক্ষায় কাটছে তাঁদের দিন–রাত।
রাজাপুর ইউনিয়নের রামনেওয়াজ ঘাট এলাকার বাসিন্দা নাহিদ ইসলাম, মো. মোস্তফা ও মমিন তালুকদার বলেন, তিন দিন ধরে রামনেওয়াজ ঘাট ও মাছঘাট এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে রয়েছে, এতে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী। চরফ্যাশনেও একই চিত্র। উপজেলার ঢালচর ইউনিয়নের মৎস্য ব্যবসায়ী শাহে আলম ফরাজী বলেন, জোয়ারের কারণে মানুষের ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু ভেসে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে এবং মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। পূর্ব ঢালচরে একটি কিল্লা (আশ্রয়কেন্দ্র) নির্মাণ করা হলেও সেটি বসতি এলাকার বিপরীত পাশে খালের ওপারে। খালের ওপর কোনো সেতু না থাকায় সাধারণ মানুষ প্রয়োজনে সেখানে যেতে পারছে না।



