নীরবে ভালোবাসার যে শিল্প, তা শিখিয়েছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। তাঁর লেখা ও গাওয়া ‘আমি কাউকে বলিনি সে নাম, কেউ জানে না...’ কালজয়ী হয়ে উঠেছে। আজ এই গুণী শিল্পীর মৃত্যুর ১৮ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা সঞ্জীব এখনও ভক্তদের মনে সমানভাবে বিরাজ করছেন। পুরো দিন সামাজিক মাধ্যমে তাঁর গান ও ছবি ভাগ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন অসংখ্য অনুরাগী।
১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের মাকালকান্দি গ্রামে জন্ম নেওয়া সঞ্জীবের লেখাপড়ার হাতেখড়ি ছিল উজ্জ্বল। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে মেধাতালিকায় স্থান লাভের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে নাম লেখালেও সেখানে মন টেকেনি তাঁর। পরবর্তীতে ভর্তি হন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে, এবং পেশা হিসেবেও বেছে নেন সাংবাদিকতা। ফিচার লেখায় নিজস্ব একটি ভাষার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি চর্চা চালিয়েছিলেন কবিতা, নাটক ও গল্পের। আশির দশকে তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘রাশ প্রিন্ট’ বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে সেরা গ্রন্থের সম্মান লাভ করে। এমনকি ‘সুখের লাগিয়া’ নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিল্পী।
সংগীতের জগতে সঞ্জীবের পথচলা শুরু হয় ‘শঙ্খচিল’ দলের মাধ্যমে। পরবর্তীতে শিল্পী বাপ্পা মজুমদারের সাথে মিলে গড়ে তোলেন জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘লছুট’। ১৯৯৭ সালে ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম ‘আহ’ বের হওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে আসে ‘হৃদয়পুর’, ‘স্বপ্নবাজি’, ‘আকাশচুরি’, ‘জোছনা বিহার’র মতো একাধিক কালজয়ী অ্যালবাম। ফোকগানের প্রতি তীব্র টান থেকে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ‘গাড়ি চলে না’ গানটি তাঁর কণ্ঠে বিপুল শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জন করে। পাশাপাশি ‘বন্ধুর বাড়ির রঙের মেলায়’, ‘আগুনের কথা’র মতো কামরুজ্জামান কামুর লেখা গানগুলোও দারুণ সাড়া ফেলেছিল।
ভালোবাসা, প্রেম, বিচ্ছেদ এবং প্রতিবাদ—প্রতিটি বিষয়ই তাঁর গানে পেয়েছিল এক স্বতন্ত্র রূপ। শোষকের বিপক্ষে সর্বদা সোচ্চার এই শিল্পী কঠিন বাস্তবতার মুখেও সংগীতের মাধ্যমে প্রতিবাদ চালিয়ে গেছেন। তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়া সুর ও কথার জাদু কেবল কনসার্টই সীমাবদ্ধ ছিল না, ঘরোয়া আসরেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন প্রজন্মের কণ্ঠেও তাই আজও ধ্বনিত হচ্ছে ‘আমি রাগ করে চলে যাবো, ফিরেও আসবো না...’, কিংবা ‘আমি ফিরে পেতে চাই সেই বৃষ্টিভেজা সুর...’। এই গভীর চাওয়াই প্রমাণ করে, সঞ্জীব চৌধুরী গানের ভাবে অমর।




