ময়মনসিংহের এক পরিবারের নয় সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যু অবলম্বনে নির্মিত ওয়েব সিরিজ ‘চক্র’ এর দ্বিতীয় মৌসুম ‘চক্র ২’ সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে। প্রথম মৌসুম দর্শকদের কিছু মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেলেও সচেতনভাবে পুরো রহস্য উন্মোচন করেনি, বরং কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন ঝুলিয়ে রেখেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এই সিরিজ কেবল পুরনো প্রশ্নের জবাব দিতেই আসেনি, বরং রহস্যের গভীরতা বাড়িয়ে ও মানবিক অন্ধকার দিকগুলোকে আরও জটিলভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

নির্মাতা ভিকি জাহেদ গল্পের সূত্রপাত ঘটিয়েছেন আগের মৌসুমের শেষ প্রান্ত থেকেই। চরম সংকটের সময়ে একটি পরিবারের সদস্য লুবনা তার শিক্ষক হুমায়ূনের কাছ থেকে সহায়তা প্রত্যাশা করলে ঘটনার গতিপথ ভিন্ন খাতে বয়ে যায়। প্রত্যাশিত সহায়তার বদলে হুমায়ূনের আচরণই রহস্যটিকে অধিকতর ঘন করে তোলে, যা ‘চক্র ২’-কে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়—এটি রহস্য সমাধানের গল্প নয়, বরং রহস্যের ভেতরে প্রবেশের গল্প। নির্মাতার এ যাবতের কাজ ‘পুনর্জন্ম’, ‘আকা’, ‘রেডরাম’, ও ‘দ্য সাইলেন্স’-এর মতোই মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ঘরানার এক নিজস্ব ভাষা নির্মাণের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।

সিরিজটির কেন্দ্রীয় দর্শন ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটিকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ—‘অ্যানিকে আমি নিয়ন্ত্রণ করেছি মায়া, ভালোবাসা আর নির্ভরতা দিয়ে’—একটি সম্পর্কের বিবরণ ছাড়াও পুরো সিরিজের দার্শনিক ভিত্তি গড়ে তোলে। পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণ করার মানবিক আকাঙ্খা ও নিজের ভেতরের লোভ বা ক্ষমতার স্পৃহা নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বই এখানে ধীরেধীরে প্রসারিত হয়। একটি কবিতার পংক্তির মতোই, ‘চক্র ২’ মানুষের বাহ্যিক মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার সত্তার অনুসন্ধান করেছে, যা একজন ব্যক্তি সম্পর্কে অন্যদের অজানা থেকে যায়।

চরিত্রায়ণের গভীরতাই এই সিরিজের প্রধান শক্তি। অ্যানি চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধনের চোখের ভাষা, সংলাপের গতি ও নীরবতা দক্ষতার সঙ্গে চরিত্রটির মানসিক দ্বন্দ্ব ও অবসাদ ফুটিয়ে তোলে। স্বামীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তার আবর্তিত মোনোবিপর্যয় স্পষ্ট হয়। হুমায়ূন চরিত্রে তৌসিফ মাহবুব সংযত অভিনয়ের মাধ্যমে ভীতি সৃষ্টিকারী এক ঠান্ডা বাস্তবতা উপস্থাপন করেছেন। তাঁর দৃষ্টি ও কঠিন উচ্চারণ একটি নিয়ন্ত্রিত রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি তৈরি করে, আর অতীত ও বর্তমানের দুই সময়ের অভিনয় পার্থক্য কাহিনিকে সুদৃঢ় করে।

জেনি চরিত্রে মৌসুমী মৌ এই সিরিজের একটি নিহিত চমক। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক নারীর শারীরিক ভাষা, মানসিক বিপর্যয় ও আবেগের স্বরণকে তিনি অত্যন্ত গভীরভাবে তুলে এনেছেন, তাঁর অভিনয়ে যে দুর্বলতার ছাপ আছে তা চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তোলে। শোনা যায়, নির্মাতা ভিকি জাহেদ তাকে ‘সেন্ট অফ আ ওমেন’ চলচ্চিত্রের আল পাচিনোর অভিনয় থেকে ধারণা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা শেষ ফলাফলে প্রতিভাত হয়েছে। সাংবাদিক রাহাতের ভূমিকায় আরেফিন জিলানী তাঁর পূর্বতন পরিণত অভিনয়ের প্রমাণ দিয়ে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রেম ও সংশয় ফুটিয়েছেন। গাজী রাকায়েতের সংযত উপস্থিতি কাহিনিতে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে ওঠে, যেখানে সংক্ষিপ্ত সংলাপ ও দৃষ্টিভঙ্গিই মুখ্য।

প্রকৃতিগতভাবে নির্মাণশৈলী সিরিজটির স্বাক্ষর বহন করে। আলো-ছায়ার ব্যবহার, কাছ থেকে ধারণকৃত ফ্রেম ও ধীর গতি মিলিয়ে একটি ক্লস্ট্রোফোবিক পরিসর রচিত হয়েছে, যা দর্শককে গল্পের ভেতরে টেনে নিয়ে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। পটভূমির সংগীত মিতব্যয়ী অথচ কার্যকর। পুরো সিরিজ জুড়েই এক তীক্ষ্ণ টান টান উত্তেজনা বজায় থাকলেও, চতুর্থ পর্বের পর কিছু দৃশ্য পুনরাবৃত্তির মত মনে হওয়ার কারণে গল্পের গতি কিছুটা স্তিমিত হয়।

সর্বোপরি, ‘চক্র ২’ সহজ বিনোদনের সিরিজ নয়। এটি ধীরগতিতে পর্দায় উন্মোচিত হয়, দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে এবং এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে ঠেলে দেয়। রহস্যের পূর্ণ সমাধান না দেওয়ার সাহসই এর আসল শক্তি। সব অভিনেতার সংযত অভিনয় পুরো প্রযোজনাটিকে বহুদূর নিয়ে গেছে এবং বাংলাদেশি ওটিটি প্লাটফর্মের মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ধারায় এটি এক মূল্যবান সংযোজন বলে বিবেচিত হতে পারে।