একইসঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির সংকট—এই দুই বৈশ্বিক সমস্যার একটি সমন্বিত সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছেন একদল আন্তর্জাতিক গবেষক। দক্ষিণ কোরিয়ার ইওহা ওমেন্স ইউনিভার্সিটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস (ইউসিএলএ)-র বিজ্ঞানীরা ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক থেকে সরাসরি উচ্চ মানের হাইড্রোজেন জ্বালানি উৎপাদনের একটি নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেছেন।
গবেষণাটি পিএনএএস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এতে ‘অ্যালকালাইন থার্মাল ট্রিটমেন্ট’ বা এটিটি নামক একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা পূর্বে সামুদ্রিক শৈবাল থেকে হাইড্রোজেন তৈরির কাজে প্রয়োগ করা হয়েছিল। পরীক্ষায় পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি), পলিইথিলিন (পিই) এবং পলিপ্রোপিলিনের (পিপি) মতো বহুল ব্যবহৃত মিশ্র প্লাস্টিক বর্জ্য নেওয়া হয়। সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড ও তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো ধরনের প্লাস্টিক আলাদা না করেই ৯০ শতাংশের বেশি বিশুদ্ধ হাইড্রোজেন গ্যাস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক বাছাই করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। বিশ্বে উৎপাদিত প্লাস্টিকের মাত্র ৯ শতাংশ রিসাইকেল হয়। নতুন এই প্রযুক্তি সেই জটিলতা দূর করেছে। ইউসিএলএর কেমিক্যাল ও বায়োমলিকুলার ইঞ্জিনিয়ার আ-হিউং পার্ক বিষয়টি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য দ্রুত জমছে এবং জ্বালানির কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন অপরিহার্য। এই প্রযুক্তি এক সৃজনশীল ও কার্যকর উপায়ে উভয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে।
প্রচলিত হাইড্রোজেন উৎপাদন পদ্ধতির তুলনায় এই নতুন কৌশলের দুটি প্রধান সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, এতে ৩০০ থেকে ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। দ্বিতীয়ত, উপজাত হিসেবে উৎপন্ন কার্বনের ৭৫ শতাংশই কঠিন রূপে আটকে ফেলা যায়, ফলে তা বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড হিসেবে নির্গত হয় না। গবেষকরা জানিয়েছেন, সরাসরি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসের এই সক্ষমতা প্রমাণ করে যে এটিটি প্রক্রিয়া অধিকতর পরিবেশবান্ধব।
পিই এবং পিপি প্লাস্টিক সাধারণত সহজে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় না। তাই এই পরীক্ষায় প্লাস্টিককে আগে থেকে গরম ও অক্সিডাইজ করে নেওয়া হয়, যাতে বিক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে। ইওহা ওমেন্স ইউনিভার্সিটির বস্তুবিজ্ঞানী উ-জায়ে কিম মতে, বাণিজ্যিকীকরণের পথে প্লাস্টিক বাছাইয়ের খরচ ও জটিলতা একটি বড় বাধা ছিল, যা এটিটি প্রযুক্তি দূর করতে সক্ষম হয়েছে।
বোতল, ব্যাগ, স্ট্র বা খাবারের পাত্র—খনিজ তেলনির্ভর এসব পণ্য পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকর। আবার গতানুগতিক হাইড্রোজেন উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়াতে হয়, যা প্রচুর কার্বন নিঃসরণ করে। বর্জ্য প্লাস্টিককে হাইড্রোজেনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের এই পদ্ধতি বাণিজ্যিক রূপ লাভ করতে পারলে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা অনেকখানি কমানো যাবে বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।




