নেদারল্যান্ডসের হারলেম শহরের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে, পুরনো বইয়ের ব্যবসায়ী পিটার ডি ভ্রিসের ইমেইল ইনবক্সে একটি অদ্ভুত অনুরোধ জমা পড়ে। ‘নাটালিয়া’ নামের এক নারী, যিনি নিজেকে ‘২০৭৭এআই’ নামক কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন, তিনি বইয়ের একটি ‘বেশ বড় অর্ডারের’ কথা জানিয়ে একটি স্প্রেডশিট সংযুক্ত করেন। তালিকায় ছিল ৩০০০-এরও বেশি আইএসবিএন নম্বর, যার সঙ্গে মিলিয়ে শিরোনাম নিশ্চিত করা, দরপত্র প্রস্তুত ও চীন দেশে পাঠানোর জন্য জাহাজ ভাড়ার তথ্য চাওয়া হয়। ডি ভ্রিস বার্তাটিকে স্প্যাম বা ফিশিং ভেবে গুরুত্ব না দিয়েই উপেক্ষা করেন।
কয়েক সপ্তাহ পর এক ডাচ সাংবাদিক যোগাযোগ করলে তিনি জানতে পারেন, পুরো বিষয়টির সাথে জড়িয়ে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফরচুনকে দেওয়া ইমেইল ও তালিকায় ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৩০০১টি বইয়ের তালিকা ছিল, যার সিংহভাগ ছিল এমেরাল্ড পাবলিশিং, এলসেভিয়ার, উইলি, রাউটলেজ ও অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মতো একাডেমিক প্রকাশকের ব্যবসা, শিক্ষা, প্রকৌশল, নীতি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। ‘খুবই অস্বাভাবিক,’ ভ্রিস বলেন, ‘এই কারণেই আমি অনুরোধটিকে স্প্যাম বা ফিশিং হিসাবে বিবেচনা করেছিলাম।’ শুধু ভ্রিস নন, নেদারল্যান্ডসের আরও বেশ কিছু পুরনো বইয়ের দোকানও একই ইমেইল পেয়ে স্প্যাম মনে করেছিল।
এআই কোম্পানির বইয়ের প্রতি ক্ষুধা
তবে এই ইমেইলে কোথাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বইগুলোর ব্যবহারের উল্লেখ ছিল না। অথচ এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন এআই কোম্পানিগুলো বড় ভাষার মডেল প্রশিক্ষণের জন্য মুক্ত ইন্টারনেটের বাইরে উচ্চমানের লিখিত উপকরণের সন্ধান করছে। গত বছর, অ্যানথ্রপিকের মামলার নথি থেকে জানা যায়, কোম্পানিটি লক্ষাধিক ভৌত বই কিনে সেগুলোর বাইন্ডিং সরিয়ে স্ক্যান করে মূল কপি ধ্বংস করে ‘প্রজেক্ট পানামা’ নামের একটি অভ্যন্তরীণ কর্মসূচির আওতায় ডিজিটাল লাইব্রেরি তৈরি করেছিল। এই প্রক্রিয়াকে ‘ডিস্ট্রাক্টিভ স্ক্যানিং’ বলা হয়, যেখানে বইয়ের মেরুদণ্ড কেটে পৃষ্ঠাগুলো দ্রুত স্ক্যানারে পাঠানোর পর বাকি অংশ ফেলে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে একটি ফেডারেল আদালত আইনি ভাবে কেনা বই এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহারকে ‘ন্যায্য ব্যবহার’ হিসেবে রায় দেয়। অ্যানথ্রপিকের এক মুখপাত্র জানান, তাদের ক্লড মডেলগুলো প্রকাশিত ওয়েব তথ্য, বাণিজ্যিক উপাত্ত ও অভ্যন্তরীণ তথ্যের মিশ্রণে প্রশিক্ষিত, এবং তারা কোনও দুর্লভ বা প্রাচীন বই ধ্বংস করে না।
লুকায়িত সরবরাহ শৃঙ্খল
আদালতের নথিপত্র থেকে বোঝা যায় বই কেনার পর কী হয়, কিন্তু কোম্পানিগুলো প্রথমে কোটি কোটি ভৌত বই কীভাবে জোগাড় করে তা স্পষ্ট ছিল না। চলতি বছর, ৪০৪ মিডিয়ার প্রতিবেদনে প্রকাশ, আইএসবিএনডিবি নামের এক কোম্পানি ১ হাজার থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত ছাপা বই সরবরাহে এআই ল্যাবগুলিকে সাহায্য করার পরিষেবা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। যদিও পরে ওই কোম্পানি ফরচুনকে জানায়, পরিষেবাটি কখনো চালু হয়নি এবং ওয়েবসাইটের তথ্যগুলো একটি অনুসন্ধানী ধারণা মাত্র ছিল। জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডেও পুরনো বই বিক্রেতাদের কাছে অতি বিশেষায়িত বইয়ের বিশাল অর্ডার আসার খবর বেরিয়েছে।
একটি অ্যালগরিদমনির্ভর শিল্পের জন্য, এই ইমেইলটি আসলে আরও বাস্তব একটি বিষয়ের দুর্লভ আভাস দেয়: সেই ভৌত বইয়ের সরবরাহ শৃঙ্খল যা শেষ পর্যন্ত এআই মডেলগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে। ফরচুন ২০৭৭এআই কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করলে তারা কোনও মন্তব্য করেনি।




