চীনের চিয়াংসি প্রদেশের উউইউয়ান কাউন্টির অন্তর্গত ইয়ানতিয়ান গ্রাম বর্তমানে কৃষি-পর্যটনের এক মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। চিয়াংসি ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসের ‘এক্সপেরিয়েন্সিং চায়না’ কোর্সের আওতায় শিক্ষার্থীরা এই গ্রাম পরিদর্শন করেন। সফরের লক্ষ্য ছিল চীনের গ্রামীণ সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের বাস্তব চিত্র দেখা। গ্রামটির চারপাশে সবুজ পাহাড়, পাথরের খিলানযুক্ত সেতু এবং স্বচ্ছ জলধারা মিলে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এখানে ১ হাজার ৫০০ বছরের বেশি পুরোনো একটি কর্পূরগাছ রয়েছে, যা ‘কর্পূর বৃক্ষরাজ’ নামে পরিচিত। সকালে মোরগের ডাক ও হাঁসের কলরবে গ্রামের জীবন শুরু হয়।
গ্রামটিতে ‘হুই’ স্থাপত্যশৈলীর ৭৬টি সংরক্ষিত বাড়ি ও সম্প্রতি সংস্কার করা দুটি পৈতৃক স্মৃতিভবন রয়েছে। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, সং থেকে চিং রাজবংশ পর্যন্ত এই গ্রামের ২৭ জন পণ্ডিত ও সরকারি কর্মকর্তা রাজকীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। গ্রামের শান্ত পরিবেশ শহরের কোলাহল থেকে দূরে আসার আদর্শ স্থান। এটি চীনের জাতীয় ‘৪এ’ পর্যায়ের দর্শনীয় স্থানের মানদণ্ড পূরণ করেছে। গ্রীষ্মকালে (জুন-আগস্ট) ইয়ানতিয়ানের রূপ পাল্টে যায়—ধানের আঁকাবাঁকা খেত, পদ্মমূলের চাষ ও মিষ্টি আলুর জন্য উঁচু বেড—এই তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে কৃষিব্যবস্থা গড়ে ওঠে। প্রথাগত হুই স্থাপত্যের পটভূমিতে জিয়াংনান অঞ্চলের নান্দনিক সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। এ সময় প্রচুর বৃষ্টি হয় ও তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়।
জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, পর্যটন ও সংশ্লিষ্ট খাত চীনের জিডিপিতে বার্ষিক ৫.৪৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ান অবদান রাখে, যা মোট জিডিপির ৪.২৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ পর্যটক ভ্রমণের সংখ্যা ৫৬০ কোটিতে পৌঁছেছে, যা মহামারি-পূর্ববর্তী সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫ সালের বসন্তকালীন উৎসবের ছুটিতে পর্যটন থেকে আয় হয়েছে ৬৭৭ বিলিয়ন ইউয়ান। এই পরিসংখ্যান কেবল শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর নয়, বরং কৃষি-পর্যটনের দিকে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম দেশ চীন বিশাল কৃষিজমি, সমৃদ্ধ গ্রামীণ ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যের অধিকারী, যা পর্যটকদের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আগামী দশকে গ্রামীণ পর্যটন গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তিশালী চালিকা শক্তি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষি-বাস্তুতন্ত্র—যেমন চিয়াংসির উপক্রান্তীয় ধানখেত, ইনার মঙ্গোলিয়ার তৃণভূমি, ঝেজিয়াংয়ের রেশমপোকা খামার, ইউনানের চা-বাগান—প্রত্যেকেই নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক।
ইয়ানতিয়ান গ্রামের দৃশ্যপট বসন্ত ও শরতে অত্যন্ত মনোরম হয়। বসন্তে শর্ষে ফুলের সোনালি রঙে ধাপ-কাটা খেত ঢেকে যায়। শরতে হুই স্থাপত্যের রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্রামের এক প্রান্তে লাল মাটির জমিতে বয়স্ক কৃষক মিষ্টি আলুর চারা রোপণ করেন। তাঁর কৌশল প্রজন্মের অভিজ্ঞতা থেকে আসা, কোনো ম্যানুয়ালে নেই। কাছেই ধানখেতের ওপর পদ্মফুল ভেসে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, খাঁটি গ্রামীণ খামারের পরিবেশে পর্যটকদের ব্যয় আশপাশের জনপদে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক গুণক প্রভাব ফেলে। শহরের দর্শনার্থীদের কাছে ওই বয়স্ক কৃষকের কাজটি ‘খাঁটি মুহূর্ত’ হিসেবে ধরা পড়ে—এটি প্রকৃতির সান্নিধ্যের মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ইয়ানতিয়ানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ার মতো, যেখানে পরিবেশের ওপর ন্যূনতম প্রভাব ফেলে টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। মহিষ দিয়ে জমি চাষ ও প্রাকৃতিক হ্রদে বাসনপত্র ধোয়ার মতো কাজ আজও গ্রামবাসীর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এই সবকিছু গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির গভীর সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে। লেখক: মো. সৈকত হোসেন, চিয়াংসি ইউনিভার্সিটি অব ফিন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসের পিএইচডি শিক্ষার্থী।




