ভারতের আলোচিত তৃষা শর্মা মৃত্যু মামলায় নতুন মোড়। কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) সম্প্রতি আদালতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে, যেখানে তৃষার স্বামী সমর্থ সিং ও শাশুড়ি গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, এই নির্যাতনই তৃষাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়। বিয়ের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সম্পর্কের ভাঙন ও তৃষার ক্রমবর্ধমান মানসিক যন্ত্রণার বিস্তারিত চিত্র ফুটে উঠেছে এই নথিতে।
মাত্র পাঁচ মাসের দাম্পত্য জীবন ছিল তৃষার। এই অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মৃত্যুর মিনিট কয়েক আগে তিনি তাঁর ভাবিকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখেছিলেন, ‘ওকে বলো, স্ত্রীর যা অবশিষ্ট আছে, কাল এসে নিয়ে যাক। এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’ গত ১২ মে রাতের এই বার্তাটি এখন মামলার অন্যতম প্রধান প্রমাণ। এর আগে, একসময়ের ‘মিস পুনে’ খেতাবজয়ী তৃষা অভিনয়জগতেও কাজ করেছেন; পরে করপোরেট চাকরিতে যোগ দেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনলাইন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় এবং একই বছরের ৯ ডিসেম্বর তাঁদের বিয়ে হয়।
সিবিআইয়ের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই তৃষাকে অতীতের সম্পর্ক নিয়ে অপমান, অশালীন ভাষায় গালিগালাজ এবং চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতো। এসব বিষয়ে তিনি শাশুড়ির কাছে নালিশ করলে গিরিবালা সবসময় ছেলের পক্ষ নিতেন। ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ওই সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন বাবার দেখাশোনার জন্য তৃষা বাপের বাড়িতে ছিলেন, কিন্তু স্বামী ও শাশুড়ি তাঁকে দ্রুত ভোপালে ফেরার জন্য চাপ দিতে থাকেন। এই সময়েই তৃষা জানতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, স্বামীর আচরণে বিপর্যস্ত তৃষা গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেন, যা ঘিরে দাম্পত্যে নতুন করে বিরোধ বাধে। সমর্থ বারবার অপমান করলেও গিরিবালা তৃষাকে ‘খুনি’ বলে সম্বোধন করতেন বলে অভিযোগ।
মামলার নথিতে আর্থিক চাপের বিষয়টিও উঠে এসেছে। তদন্তে জানা গেছে, তৃষার প্রায় ২০ লাখ রুপির শেয়ার বিনিয়োগ ছিল, যা যৌথ ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের জন্য সমর্থ ও তাঁর মা চাপ দিচ্ছিলেন। তৃষা তা প্রত্যাখ্যান করে জানান, ওই অর্থ তাঁর বাবার। এদিকে তৃষার মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। ৩০ এপ্রিল মাকে পাঠানো বার্তায় তিনি লেখেন, ‘আমার জীবন নরক হয়ে গেছে।’ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তিনি; চিকিৎসকের মতে, তৃষা তীব্র উদ্বেগ ও মানসিক চাপে ভুগছিলেন এবং তাঁকে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।
গত ৬ মে তৃষা আগের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং ওই দিনই গর্ভপাতের প্রথম ওষুধ খান। পরদিন ভোরে তিনি মাকে বারবার বার্তা পাঠিয়ে ওই বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। ৮ মে দ্বিতীয় ওষুধ খাওয়ার পর তৃষা শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন; প্রচণ্ড ব্যথা ও রক্তক্ষরণ শুরু হলে সমর্থ তা ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দেন এবং শাশুড়িও উপেক্ষা করেন বলে অভিযোগ। ৯ মে মাকে পাঠানো বার্তায় তৃষা জানান, সমর্থ এমনকি প্রশ্ন তুলেছেন যে গর্ভপাত হওয়া সন্তানটি তাঁরই কি না। তিনি লিখেছিলেন, ‘এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।’ তদন্তকারীরা জানান, তৃষার সাবেক নিয়োগকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়িতে সবসময় তাঁর উপর নজরদারি ও ফোনালাপ পর্যবেক্ষণ করা হতো; ফলে কাছের পার্কে গিয়ে কথা বলতেন তিনি।
মৃত্যুর দিন ১২ মে সকালেই বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৃষা। রাজস্থানের নাসিরাবাদের ট্রেনের টিকিটের জন্য তিনি মায়ের কাছে তিন হাজার রুপি চান এবং টিকিটও কেটে ফেলেন। পরে সমর্থ দাম্পত্য পরামর্শে যেতে রাজি হলে দুজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কাকলি রায়ের সঙ্গে দেখা করেন; চিকিৎসক সমর্থকে ধৈর্য ধরে স্ত্রীর কথা শোনার পরামর্শ দেন এবং দুজনকেই মাদক ব্যবহার বন্ধ করতে বলেন। বিকেলে তৃষা একটি বিউটি পার্লারে যান। সন্ধ্যায় ফিরে এসে সমর্থ ও গিরিবালা তাঁকে উপেক্ষা করে হাঁটতে বেরোন। এরপর মাকে ফোন করে তৃষা জানান, এই সম্পর্ক আর বাঁচানো সম্ভব নয় এবং তিনি চিরতরে ভোপাল ছেড়ে চলে যাবেন। রাত ৯টা ২০ মিনিটে ভাবি রাশি আবরোলের সঙ্গে ফোনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি; অভিযোগ, পিঠে ব্যথা থাকায় স্বামীকে ঘরে ঘুমাতে বলা হলে তিনি উল্টো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে আসে সেই শেষ বার্তা, ‘এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ৯টা ৪০ মিনিটে তৃষা একা ছাদে ওঠেন। এক মিনিট পর বাবাকে ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সমর্থ খুব আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন, তিনি ভয় পাচ্ছেন এবং বাবা-মাকে দ্রুত আসতে বলেন। রাত ১০টা ৫ মিনিটে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন তিনি; এরপর মা বারবার ফোন করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে শাশুড়িকে ফোন করে মেয়ে কাঁদছে বলে খোঁজ নিতে অনুরোধ করেন। রাত ১০টা ২৩ মিনিটে গিরিবালা ও পরে সমর্থ ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর তৃষাকে নিচে নামিয়ে ভোপালের এইমসে নেওয়া হলে রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ মামলায় প্রথম থেকেই নানা বিতর্ক ছিল। পরিবারের অভিযোগের পর আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত হয়; দিল্লি এইমসের বিশেষজ্ঞ বোর্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার ফলেই তৃষার মৃত্যু হয়েছে এবং শরীরে হামলার গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ফলে সিবিআইয়ের অভিযোগ হত্যা নয়; বরং দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণ তাঁকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছে। ফরেনসিক মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক নির্যাতন, হতাশা ও একাকিত্বের শিকার ছিলেন তৃষা; পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থনের অভাবে তিনি চরম সিদ্ধান্ত নেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সমর্থ সিং ও গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে সিবিআই। তবে তদন্ত শেষ নয়; তৃষার আইফোনের ফরেনসিক তথ্য এখনো বিশ্লেষণাধীন এবং বাড়ির সিসিটিভি রেকর্ডারের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পণ-সংক্রান্ত অভিযোগের দিকটিও আলাদাভাবে তদন্ত করছে সংস্থাটি।




