পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে একের পর এক খুনের ঘটনায়। ভারতের এই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় সম্প্রতি যে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তাতে নিহতরা সবাই মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য। ঘটনাগুলোর জেরে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে, পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস থানার কারিশুন্ডা গ্রামে নিজ বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন মোহাম্মদ মাফিক নামের এক বৃদ্ধ। তাঁর ছেলে আবদুল হাফিজ ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সদস্য, সম্প্রতি দিল্লিতে দলটির প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। এই ঘটনায় দলটির শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাঙ্কা দিল্লি থেকে সহকর্মীদের নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং মাফিকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন। রাঙ্কা রাজ্য সরকারকে ১০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে দাবি করেছেন, এই সময়ের মধ্যে সব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে কঠোর আইনি সাজা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি ইন্দাস থানার পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এবং আদালত-পর্যবেক্ষিত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। রাঙ্কা বলেন, পুলিশ প্রশাসন নিহতের পরিবারের পাশে সঠিকভাবে দাঁড়ায়নি, তাই তদন্তে স্বচ্ছতা আনার প্রয়োজন।
নিহত মাফিকের পরিবার রাজ্য সরকারের দেওয়া আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাঁর ছেলে আবদুল হাফিজ বাবার স্মরণে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে এমন একটি স্কুল তৈরি করাই বাবার প্রতি সঠিক সম্মান জানানো হবে। সিজেপি নেতা রাঙ্কা এই দাবিতে সমর্থন জানিয়ে ঘোষণা করেন, তাঁরা হাফিজকে আর্থিক সহায়তা দেবেন এবং রাজ্যব্যাপী ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন শুরু করবেন। সেই সঙ্গে সময়সীমার মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না হলে জেলা প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, নদীয়া জেলায় গত শনিবার রাতে সংঘটিত জোড়া খুনের ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। স্থানীয় হরনগর পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান ফাতেমা বিবি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাহেব আলী মণ্ডল এবং মিঠু শেখকে আটকের পর রবিবার তাদের আদালতে তোলা হলে ৯ দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। ওই রাতে রেলওয়ে আন্ডারপাসের কাছে গাড়ি আটকে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ৫৪ বছর বয়সী কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান ও তাঁর আইনজীবী ছেলে ২৩ বছর বয়সী আবু সুফিয়ানকে হত্যা করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব জড়িত। কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার অতুল ভি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবর নিশ্চিত করেছেন, তবে হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য এবং এর পেছনে আরও কারা রয়েছে তা এখনই বলা তাড়াহুড়ো হবে বলে জানিয়েছেন।
এই ঘটনাগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার সাবেক ডেপুটি স্পিকার আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মহত্যার খবরও এসেছে। এর ফলে রাজ্যের রাজনীতি আরও ঘোলা হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে খুনের দায় এড়ানোর সুযোগ কম থাকলেও, বিরোধীরা সরকারকে তেমন কোণঠাসা করতে পারছে না। প্রধান বিরোধী দল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস এখন অনেকটাই দুর্বল, অন্যদিকে সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং তৃণমূলের ঋতব্রতপন্থী অংশ এখনও নিজেদের সংগঠিত করতে পারেনি। ফলে বিজেপির ওপর চাপ তেমন বাড়েনি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে পরপর এতগুলো খুনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবল ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।




