রান্নাঘরে প্রবেশ করেই মুহূর্তে উদ্দেশ্য ভুলে যাওয়া, অফিসের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝপথে পরের বাক্যটি মনে করতে না পারা, অথবা পরিচিতজনের নাম জিহ্বার আগায় এসেও উচ্চারণে ব্যর্থ হওয়া—এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই মানসিক ধোঁয়াশা অবস্থাকে অভিহিত করা হয় ‘ব্রেন ফগ’ নামে। এটি কোনো স্বতন্ত্র রোগ নয়; বরং কিছু উপসর্গের সমষ্টি, যা স্মৃতি ও মনোযোগকে দুর্বল করে চিন্তার গতিকে স্থিমিত করে তোলে। চিকিৎসকদের ব্যাখ্যামতে, এই অবস্থার পেছনে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব অথবা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতাও দায়ী হতে পারে। নারীদের মধ্যে মেনোপজ বা তার পূর্ববর্তী সময়কালে হরমোনের তারতম্যও এর একটি কারণ। তেমনই দীর্ঘমেয়াদি কোভিড বা লুপাসের মতো অটোইমিউন অসুখেও এই সমস্যা প্রকট হয়। তবে ইতিবাচক দিক হলো, দৈনন্দিনের ছোটখাটো অভ্যাসে পরিবর্তন আনলেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই অবস্থার উন্নতি সম্ভব।
অক্সফোর্ডের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. থারাকা ‘ব্রেগ ফগ’ মোকাবেলায় একটি সরল কৌশল অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সোয়ান্স (SWANS)’। এর প্রথম ধাপ হলো পর্যাপ্ত ঘুম। প্রতিরাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টার ঘুম নিশ্চিত করতে হবে, কেননা এই সময়েই মস্তিষ্ক স্মৃতিকে বিন্যস্ত করে এবং নিজের পুনর্গঠনের কাজ সারব। দ্বিতীয়ত, শরীরে পানির স্বল্পতা যাতে না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, কারণ ডিহাইড্রেশন সরাসরি মনোযোগ কমিয়ে দিতে প্রভাবিত। তৃতীয় উপাদান হিসেবে রয়েছে শারীরিক সক্রিয়তা। দৈনিক কিছুক্ষণ হাঁটা, সাধারণ ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়িয়ে চিন্তাকে স্বচ্ছ করে।
চতুর্থ পরামর্শ হলো পুষ্টিকর খাবার। ডিম, মাছ, বাদাম ও শাকসবজির মতো প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদান মস্তিষ্কের জন্য বিশেষভাবে উপকারী; বিশেষ করে কোলিন সমৃদ্ধ খাবার স্মৃতি ও মনোযোগের ক্ষমতা বর্ধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। শেষটি হলো মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ। দীর্ঘ সময়ের ধকল শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা অস্বাভাবিক রকম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা পরবর্তীতে চিন্তার স্বচ্ছতাকে নষ্ট করে ফেলে। তাই ধ্যানচর্চা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, অথবা ভালোবাসার কোনো বই বা শখের পেছনে সময় ব্যয় করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
নিজের প্রতি সহমর্মিতার সঙ্গে আচরণ করাটাও একটি জরুরি পদক্ষেপ। মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটলেই আমরা নিজেকে দোষারোপ করতে থাকি, অথচ চিকিৎসাবিদ্যার ভাষ্যমতে এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটি মস্তিষ্কের একটি সতর্কবার্তা, যা জানান দিচ্ছে যে তিনি ক্লান্ত এবং বিশ্রাম প্রয়োজন। কাজ ভাগ করে নেওয়া অথবা সাহায্য চেয়ে নেওয়াও এক ধরনের কৌশলী আত্ম-সচেতনতা।
আরেকটি কার্যকর কৌশল হল একটি সুসংগঠিত রুটিনে নিজেকে বেঁধে নেওয়া। সকালের পোশাক নির্বাচন, সকালের নাশতা বা অফিসের ব্যাগ গোছানো—এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলো পূর্ব রাতেই সম্পন্ন করে ফেললে মস্তিষ্কের উপর থেকে অহেতুক চাপের অনেকটাই কমে যায়। আবার একটানা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে প্রতি কয়েক ঘন্টা পর পাঁচ থেকে দশ মিনিটের সংক্ষিপ্ত বিরতির অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এই সময়টুকুতে হাঁটাহাঁটি, পানি পান করা বা জানালার পাশে দাড়িয়ে থাকলেই মস্তিষ্ক তার কার্যক্ষমতা ফিরে পেতে পারে। সবকিছু মুখস্থ রাখার একচেটিয়া দায়ভার মস্তিষ্কের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে বরং ফোনের ক্যালেন্ডার বা রিমাইন্ডারকে বন্ধু বানানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে কখনোই যদি দীর্ঘদিন ধরে মনোযোগের অভাব চলে, স্মৃতিশক্তির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয় অথবা এই ব্যাঘাত দৈনিন্দিন কাজকর্মকে ব্যহত করে তোলে, সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বিলম্ব করা ঠিক হবে না। এর আড়ালে থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক কারণও লুকিয়ে থাকতে পারে। যেভাবে আমরা শারীরিক অবসন্নতাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি, ঠিক সেভাবেই মস্তিষ্কের ক্লান্তিকেও স্বীকার করতে শিখতে হবে। সর্বদা আরও দ্রুতগতিতে ছুটে চলাই সব সমস্যার সমাধান নয়; বরং ইচ্ছে করেই মাঝে মাঝে থামা, বিরতি নেওয়া এবং নিজের প্রতি একটু যত্নবান হওয়াই আমাদের মানসিক কর্মকুণ্ঠতাকে তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে পারে।




