বন্ধুত্ব নিয়ে চিন্তা করলে প্রথমেই মনে পড়ে শৈশবের সেই সহজ-সরল দিনগুলোর কথা। তখন বন্ধু হতে কোনো জটিলতার প্রয়োজন হতো না—একই বেঞ্চে বসা, একসঙ্গে খেলাধুলা করা, কিংবা টিফিন ভাগ করে নেওয়াই যথেষ্ট ছিল। বন্ধুত্বের কোনো সংজ্ঞা বা শর্ত ছিল না; শুধু ছিল পরস্পরের পাশে থাকার আন্তরিক ইচ্ছা। স্কুলে একদিন অনুপস্থিত থাকলেই পাঁচ-ছয়জন বন্ধু বাড়ির দরজায় হাজির হয়ে যেত। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন অফিসে টানা তিনদিন না গেলেও অনেকে খেয়াল করে না। জন্মদিন মনে রাখতে আর ক্যালেন্ডারের প্রয়োজন হয় না; ফেসবুকের নোটিফিকেশনই সব কাজ করে দেয়। মোবাইলের কন্টাক্ট লিস্টে শত শত নাম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো সংযোগ থাকলেও, গভীর রাতে কোনো কারণ ছাড়া ফোন করা যায় এমন মানুষের সংখ্যা খুবই সীমিত। দেখা করার জন্য আগে কোনো উপলক্ষ প্রয়োজন হতো না, এখন দুজনের ক্যালেন্ডারের ফাঁকা সময় মেলানোই যেন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিনটির কথাও খুব মনে পড়ে। প্রায় সবাই বলেছিল, ‘যোগাযোগ থাকবে।’ কিন্তু সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে—চাকরি, সংসার, শহর পাল্টানো, বেড়ে চলা দায়িত্ব। সেই প্রতিশ্রুতিময় ‘যোগাযোগ থাকবে’ কথাটি ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় জমা হয়েছে। কেউই প্রতিশ্রুতি ভাঙতে চায়নি, কিন্তু জীবন সবার জন্যই আলাদা পথ বেছে নিয়েছে।

তবে কিছু সম্পর্ক আছে, যাদের শক্তি নিয়মিত কথোপকথনে নয়, বরং একটি নিশ্চিন্ত নীরবতার মধ্যে। মাসের পর মাস কোনো কথা না হলেও হঠাৎ একটি ফোনকল শোনায়, ‘কিরে, বেঁচে আছিস তো?’ আর ঠিক তখনই মনে হয় সময় থমকে গিয়েছিল। এই ধরনের সম্পর্কের সৌন্দর্যই হলো—তারা নিঃশর্ত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এখানে কোনো যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হয় না। একজন প্রকৃত বন্ধু আপনার সাফল্যের প্রশংসা যেমন শুনতে পারে, তেমনি ব্যর্থতার দীর্ঘ নীরবতাও বোঝে। পৃথিবীর অনেক সম্পর্ক আপনাকে বিচার করবে; কিন্তু বন্ধু সেই মানুষ, যে বিচার করার আগে আপনার পাশে বসে।

বন্ধুত্বের আসল পরীক্ষা হয় আলাদা হয়ে যাওয়ার পর। যে মানুষটি আপনার প্রতিদিনের জীবনের অংশ নয়, কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে আপনার প্রথম মনে পড়ে, সেই-ই আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। জীবন অদ্ভুত—সাফল্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা কত মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই, কত হাত মেলাই। কিন্তু একসময় ফিরে তাকালে দেখা যায়, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলো পুরস্কার মঞ্চে তৈরি হয়নি; তৈরি হয়েছিল স্কুলের শেষ বেঞ্চে, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে, বা বিকেলের এক কাপ চায়ের আড্ডায়।

হয়তো এই কারণেই বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষ নতুন বন্ধু খোঁজা বন্ধ করে দেয় এবং পুরনো বন্ধুদের খোঁজে ফেরে। নতুন মানুষ আমাদের বর্তমানকে জানে, কিন্তু পুরনো বন্ধুরাই জানে আমরা কোথা থেকে উঠে এসেছি। শেষ পর্যন্ত মানুষ তার ব্যাংক ব্যালান্স, পদবি বা সাফল্যের জন্য খুব একটা মনে থাকে না। মানুষ মনে থাকে সেই কয়েকজনের স্মৃতিতে, যাদের জীবনে সে নিঃসংকোচে বন্ধু হয়ে থাকতে পেরেছিল। বন্ধু দিবস বছরে একবার এলেও, সত্যিকারের বন্ধুর কথা মনে পড়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন হয় না।