চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তার দ্রুততর হচ্ছে। চালকবিহীন ট্যাক্সি থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র নির্মাণ পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও গভীর পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উহান শহরের ৪৫ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক ইয়াও শিননংয়ের জীবনযাপন এই পরিবর্তনের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ২০২২ সালে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাইদু শহরটিতে ‘অ্যাপোলো গো’ নামে স্বয়ংচালিত ট্যাক্সি পরিষেবা শুরু করে। এরপর ইয়াওয়ের মাসিক আয় প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পায়। চলতি বছরের মার্চ মাসে অ্যাপোলো গোর কিছু গাড়ি হঠাৎ রাস্তায় থেমে যায়। ফলে যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকেন। তদন্তের জন্য পরবর্তী কয়েক মাস উহানের সড়ক থেকে এসব গাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে, ২০২৪ সালে চালকবিহীন ট্যাক্সি চালুর বিরুদ্ধে উহানে ট্যাক্সিচালকরা বিক্ষোভও করেছিলেন। তবে সেন্সরের কারণে সেই আন্দোলনে কতজন অংশ নিয়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। কারণ বিক্ষোভের খবর দ্রুত সেন্সর করা হয়েছিল।
শুধু ট্যাক্সিচালকরাই নন, শ্বেত-কলারের কর্মীরাও এআইয়ের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এআইয়ের কারণে চাকরি হারানো সাদা-কলারের কর্মীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি দেশটির কয়েকটি আদালত এআইয়ের কারণে চাকরি হারানো কর্মীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তবে অনেক কর্মীর আশঙ্কা, চাকরিতে যোগদানের আগেই তাদের জন্য এআই একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই প্রযুক্তিগত বিস্তারের পেছনে একটি দুর্বল শ্রমবাজারের প্রেক্ষাপটও রয়েছে। চীনের শ্রমবাজার ইতিমধ্যে চাপের মুখে। আবাসন খাত ও শিক্ষা খাতের মতো একসময় বড় কর্মসংস্থানের উৎস থাকা শিল্পগুলো বর্তমানে সংকটের মুখে পড়েছে। অনেক কর্মী আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাইড হেইলিং ও অন্যান্য গিগ কাজে যুক্ত হয়েছেন। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুসারে, চলতি বছর চীনে নমনীয় বা অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে থাকা মানুষের সংখ্যা ৩২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি। অর্থাৎ দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশ এ ধরনের অনিয়মিত কাজে যুক্ত হতে পারেন।
সরকারের অবস্থানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেন, ‘এআইকে অভিন্ন সমৃদ্ধি ও সবার নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হতে হবে।’ যদিও এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও এখন বেইজিং সতর্ক হতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের সরকার এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে বেশি সক্ষম। সরকার চাইলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী নিয়োগের নির্দেশ দিতে পারে। এমনকি এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান রক্ষার নীতি চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও সরকারের রয়েছে। তবে কর্মীদের জন্য এই সুরক্ষা কত দ্রুত আসবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের গতিপথ নজরে রাখা হচ্ছে।




