বর্ষার আগমনে প্রকৃতি সতেজ হয়ে উঠলেও ঘরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ প্রায়শই স্যাঁতসেঁতে ও গুমোট হয়ে পড়ে। জিনিসপত্র থেকে এক ধরনের সোঁদা গন্ধ বের হয় এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতা নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু বাড়তি যত্নই পারে অন্দরমহলকে আরামদায়ক ও নির্মল রাখতে। এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন স্থপতি তাসনিম তূর্যি, যিনি সৃষ্টি আর্কিটেকচার অ্যান্ড কনসালট্যান্সির প্রতিষ্ঠাতা, এবং গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক ফারহানা শরীফ।
বর্ষায় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এই আর্দ্রতা ঘরের ভেতর জমা হতে থাকলে দেয়াল ও মেঝে ভিজে ওঠে, ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটে এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়ে। কাঠের আসবাবপত্রের আকার বিকৃত হতে পারে এবং কাপড়ে তিলা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সর্বোপরি, ঘরের পরিবেশ তার স্বাভাবিক সতেজতা হারায়। এই সমস্ত ঝুঁকি এড়াতে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণই মূল চাবিকাঠি।
ঘরে হাওয়া চলাচল ও সূর্যের আলো প্রবেশ নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি। শহুরে বাড়িতে প্রায়শই সরাসরি রোদ আসার সুযোগ সীমিত থাকে, তবুও প্রতিদিন জানালা-দরজা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। এমন বিন্যাস রাখা ভালো যেন এক পাশের জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকে বিপরীত দিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। বৃষ্টি না থাকলে জানালা-দরজা খোলা এবং দিনের বেলা পর্দা সরিয়ে রাখা উচিত। পাতলা পর্দা ব্যবহার করলে তা সহজেই শুকায় এবং আলো-বাতাস চলাচলে বাধা দেয় না। রান্নাঘর ও ওয়াশরুমে এগজস্ট ফ্যান স্থাপন করাও কার্যকর সমাধান; প্রয়োজনে কিচেন চিমনি লাগানো যেতে পারে। ঘরের অভ্যন্তরে বায়ু চলাচলের জন্য ভেন্টিলেটর থাকলে ভালো, না থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এগজস্ট ফ্যান বসানো যায়।
দেয়াল বা ছাদে ভেজা দাগ, পলেস্তারা খসে পড়া বা সাদা-কালো ছত্রাকের আবরণ দেখা দিলে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নিতে হবে। প্লাস্টার পরিবর্তন করে ড্যাম্প প্রুফ পেইন্ট করানো জরুরি। বাড়ির বাইরের দেয়ালে অ্যান্টিফাঙ্গাল বা ছত্রাকরোধী পেইন্ট লাগানোও উপকারী। ছাদে পানি জমার সমস্যা বা ভবনের পানি নিষ্কাশন পাইপের ত্রুটির কারণেও ঘরের দেয়াল ভিজতে পারে, তাই মূল কারণ খুঁজে বের করে সারাতে হবে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বা সুইচবোর্ডের আশপাশে কোনো ভেজা ভাব দেখা গেলে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, নতুবা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের ঘর প্রতিদিন অন্তত একবার পরীক্ষা করে দেখা উচিত।
কাঠের দরজা ও আসবাবপত্র বাতাসের জলীয় বাষ্প শোষণ করে ফুলে যায়, ফলে দরজা ফ্রেমের সঙ্গে আটকে যেতে পারে এবং আসবাবের আকার বেঁকে যেতে পারে। কবজা শক্ত হয়ে গেলে তেল ব্যবহারে সাময়িক উপশম মিললেও, আকৃতির বড় পরিবর্তনে পেশাদারের সহায়তা ও প্রয়োজনে পলিশিং বা ফিলারের কাজ করাতে হবে। পানিরোধী রং করিয়েও এ সমস্যা প্রতিরোধ করা যায়। আসবাবপত্র দেয়াল থেকে অন্তত দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি দূরত্বে রাখতে হবে এবং এমন অবস্থানে স্থাপন করতে হবে যেন জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট সরাসরি না লাগে। প্রতিদিন শুকনো কাপড় দিয়ে আসবাব মুছতে হবে এবং সপ্তাহে একবার কিছুক্ষণের জন্য আসবাবের দরজা বা ড্রয়ার খুলে রাখা উচিত।
কাপড় বা বই রাখার আসবাবে শুকনা নিমপাতা, সিলিকা জেলের প্যাকেট বা কর্পূর রাখা যেতে পারে; তবে রাসায়নিক ন্যাফথালিন ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে বলে তা এড়ানোই ভালো। কাঠের আসবাবে সাধারণ কাগজ বা পলিথিনের বদলে ট্রেসিং পেপার বিছিয়ে রাখা উত্তম। দরজায় ফোমজাতীয় উপাদান ব্যবহার করলে বাইরের পানি প্রবেশে বাধা দেয়। জানালা ও বারান্দার দরজার ফ্রেমও পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত যেন কোনো ছিদ্র দিয়ে পানি না ঢোকে। ঘর মোছার পর দ্রুত শুকিয়ে ফেলতে হবে এবং বালিশ বা কুশন মাঝেমধ্যে রোদে দেওয়া প্রয়োজন।
ঘরের গুমোট ভাব দূর করতে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি সুগন্ধি মোম বা সুগন্ধি ফুল ব্যবহার করা যেতে পারে। ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করে আর্দ্রতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে বজায় রাখতে পারলে উত্তম। ইনডোর গাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং টবের নিচের প্লেটে যেন পানি জমে না থাকে। বারান্দা, ছাদ ও বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে, কারণ আবর্জনার স্তূপে পানি জমলে আশপাশের আর্দ্রতা আরও বৃদ্ধি পায় এবং দেয়াল ভেজার পাশাপাশি মশার প্রজননও ঘটে।




