সন্তানের ডিভাইস আসক্তি বা মাদক আসক্তির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের জন্য বিশেষজ্ঞ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন বিশিষ্ট শিশু-কিশোর ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল আহমেদ। প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবস উপলক্ষে গত ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে প্রথম আলোর কার্যালয়ে একটি মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভা আয়োজিত হয়। এটিই ছিল এই ধারাবাহিক আয়োজনের ১৭৮তম অনলাইন অধিবেশন, যেখানে ‘বিশ্ব মাদক সমস্যা: চলমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী ফলাফল’ প্রতিপাদ্যটি নিয়ে আলোকপাত করা হয়।
ওই সভায় টিনেজ বা কিশোর বয়সী সন্তানের অভিভাবকদের উদ্দেশে ডা. আহমেদ হেলাল সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত চারটি পরামর্শ তুলে ধরেন। প্রথম পরামর্শ হিসেবে তিনি বলেন, সন্তানের ওপর কখনোই নির্দিষ্ট কোনো টার্গেট বা জিপিএ-৫ অর্জনের চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। পরীক্ষার নম্বর কেবল একটি মুহূর্তের মূল্যায়ন, যা সন্তানের মেধা বা জীবনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি নয়। তার ভাষায়, সন্তান সমাজের কাছে কতটা গৃহীত হয়েছে এবং সে তার চারপাশের মানুষদের ভালোবাসতে পারছে কি না— এগুলোই সুষম বিকাশের প্রকৃত মাপকাঠি। শুধু ভালো রেজাল্ট করলেই বিকাশ সম্পূর্ণ হয় না, যদি তার কোনো বন্ধু না থাকে বা সে কারও সঙ্গে মিশতে না পারে।
দ্বিতীয় পরামর্শে প্রযুক্তির প্রতি অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর কথা বলেন। ডিভাইস বা প্রযুক্তিকে ভয় পেয়ে দূরে সরিয়ে না দিয়ে বরং এর ইতিবাচক ও চমৎকার দিকগুলো সন্তানের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। তাকে প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষণীয় ও সৃজনশীল কাজের চর্চায় উৎসাহিত করতে হবে।
নিজের সিদ্ধান্ত সন্তানের ওপর চাপিয়ে না দেওয়াটা তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। ডা. হেলাল আহমেদ ব্যাখ্যা করেন, অনেক অভিভাবক নিজেদের সিদ্ধান্ত জোর করে সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন, যার ফলে তার নিজস্ব বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সে নিজে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সহজেই বন্ধুদের বা সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবে পড়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই সকালের নাশতায় কোন ধরনের ডিমের অমলেট খাবে, স্কুলে কী ধরনের জুতা পরে যাবে কিংবা খেলতে যাওয়ার সময় কোন টি-শার্ট পরবে — এরকম অতি সাধারণ বিষয়গুলোতে সন্তানকে নিজের মতো ভাবতে ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
সর্বশেষ পরামর্শটিতে তিনি অভিভাবকদের সন্তানকে পরনির্ভরশীল না করার কথা বলেন। অনেক বাবা-মা গর্বভরে বলেন যে তাদের সন্তান তাদের ছাড়া কিছুই বোঝে না, অথচ এই মনোভাবকেই বিপদের সূচনা বলে চিহ্নিত করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি স্পষ্ট করেন, সন্তানের স্কুলের বই অভিভাবকের মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই, বরং যতটুকু সম্ভব ব্যাগ গোছানো ও বহনের দায়িত্ব সন্তানের নিজের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। সন্তানের ব্যাগ বয়ে দেওয়ার মধ্যে স্নেহ প্রকাশ পায় না, উল্টো তা শিশুকে পঙ্গু ও অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। কোনো কিছু নিষেধ করার সময় শুধু ‘এটা খারাপ, এটা করবে না’ বলে আদেশ না দিয়ে কেন সেটি খারাপ এবং কেন বিকল্পটি ভালো, সে কারণ যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে।




