শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের সামনে কোনো বেফাঁস মন্তব্য করে ফেলার পর কিংবা কোনো ভুল ধরা পড়লে অনেকেরই গাল তপ্ত হয়ে লালচে বর্ণ ধারণ করে। এই শারীরিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো আমাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সমন্বিত কার্যপ্রণালী। যখন কেউ মানসিকভাবে অস্বস্তিকর বা লজ্জাজনক কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তখন শরীর সেই অভিজ্ঞতাকে এক ধরনের বিপদসংকেত হিসেবে গণ্য করে।
শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি অবস্থার অ্যালার্ম সক্রিয় করে তোলে। এই অ্যালার্মের ফলস্বরূপ রক্তপ্রবাহে অ্যাড্রেনালিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন শরীরকে দ্রুত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে: হৃৎস্পন্দনের গতি বৃদ্ধি পায় ও শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে ওঠে।
তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় ঘটনাটি ঘটে ত্বকের নিচে অবস্থিত সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলোতে। অ্যাড্রেনালিনের প্রভাবে মুখমণ্ডল, বিশেষ করে গালের কাছের রক্তনালিগুলো প্রসারিত হয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি চওড়া হয়ে যায়। এই প্রসারণের কারণে সেসব স্থানে তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল পরিমাণ রক্ত জমা হয়। যেহেতু গালের ত্বক শরীরের অন্যান্য স্থানের তুলনায় অপেক্ষাকৃত পাতলা, তাই নিচে জমা হওয়া লাল রক্ত বাইরে থেকে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলেই লজ্জার মুহূর্তে মুখ লালচে দেখায়।
প্রাণিজগতের প্রেক্ষাপটে এই বৈশিষ্ট্যটি কেবল মানুষের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। একটি পোষা বিড়াল চুরি করে মাছ খাওয়ার পর হাতে-নাতে ধরা পড়লেও লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যেতে পারে, কিন্তু কখনোই তার মুখমণ্ডল লাল হবে না।
প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, গাল লাল হয়ে পড়ার এই প্রবণতা একটি বড় ধরনের অসুবিধা। কারণ, এটি অনেক সময় ব্যক্তির গোপন অনুভূতি বা ভুল অন্যদের সামনে অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ করে দেয়। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা ভিন্ন মত পোষণ করেন। ২০০৯ সালে নেদারল্যান্ডসের একদল গবেষক বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেন, লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মোটেই কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি মানুষের একধরনের ‘সুপারপাওয়ার’ হিসেবে কাজ করে।
তাদের গবেষণা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যখন সামাজিক কোনো ভুল করে বা কোনো প্রথা ভঙ্গ করে এবং সেই অপরাধবোধে তার গাল লাল হয়ে ওঠে, তখন উপস্থিত অন্য মানুষজন তাকে তুলনামূলকভাবে অনেক দ্রুত ক্ষমা করে দেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বন্ধু অনুমতি ছাড়া টিফিন খেয়ে ফেললে ধরা পড়ার পর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শুধু ‘দুঃখিত’ বললে ক্ষোভ হয়তো অক্ষুণ্ন থাকে। কিন্তু একই অবস্থায় বন্ধুটি যদি লজ্জায় রক্তিম মুখে মাথা নিচু করে ফেলে, তবে স্বাভাবিকভাবেই মনের কঠোরতা নরম হয়ে আসে।
এর কারণ হলো, মুখ লাল হয়ে যাওয়া চারপাশের মানুষদের কাছে একটি অব্যক্ত সংকেত প্রদান করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সামাজিক রীতিনীতিগুলো সম্পর্কে সচেতন, নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং তার অনুশোচনা একেবারে খাঁটি। এই আন্তরিক অনুশোচনার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ হলো সেই লালচে গাল, কারণ ইচ্ছা করলেও এই শারীরিক প্রতিক্রিয়া নকল করা সম্ভব নয়।
সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস অবলম্বনে।



