লিভারের প্রদাহ বা হেপাটাইটিসের কথা এলেই সাধারণত এ, বি বা সি ভাইরাসের নাম সবার আগে মনে আসে। কিন্তু হেপাটাইটিস ডি নামক একটি বিরল অথচ ভয়াবহ রূপও রয়েছে, যা সম্পর্কে জনসচেতনতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন, এই ভাইরাসটি অত্যন্ত মারাত্মক এবং এর সংক্রমণে লিভারের কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিশ্বে এখন পর্যন্ত হেপাটাইটিস ডি ভাইরাসের সংক্রমণ সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারে—এমন কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। একইসঙ্গে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাসপাতালে এই ভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সুবিধাও সীমিত।
এই ভাইরাসের সংক্রমণের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি স্বাধীনভাবে কারও দেহে বাসা বাঁধতে পারে না। হেপাটাইটিস ডি ভাইরাসের অস্তিত্বের জন্য হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের উপস্থিতি অপরিহার্য। ফলে যেসব ব্যক্তি ইতোমধ্যে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত, শুধুমাত্র তারাই হেপাটাইটিস ডি-এর ঝুঁকিতে থাকেন। তবে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, একজন সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষও ঝুঁকিমুক্ত নন। যদি কখনো একই সময়ে শরীরে হেপাটাইটিস বি ও ডি—উভয় ভাইরাসই প্রবেশ করে, তাহলেও জটিলতা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই সার্বিক সতর্কতা সবার জন্যই জরুরি।
সংক্রমণ ছড়ানোর মাধ্যমগুলোর মধ্যে রক্ত ও দেহরস প্রধান। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সুই, ব্লেড বা এমনকি টুথব্রাশের মাধ্যমেও ভাইরাসটি এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হতে পারে। নিরাপত্তাহীন শারীরিক সম্পর্কও সংক্রমণের বড় একটি কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, সমকামী পুরুষদের মধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। মাতৃদেহ থেকে গর্ভস্থ সন্তানের দেহেও ভাইরাস প্রবেশের ঘটনা নথিভুক্ত আছে, যদিও তা খুবই বিরল।
যেহেতু হেপাটাইটিস ডি-এর কার্যকর কোনো চিকিৎসা নেই, তাই প্রতিরোধকেই প্রধান অবলম্বন হিসেবে গণ্য করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, নির্ধারিত নিয়মে হেপাটাইটিস বি-এর টিকা গ্রহণই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। টিকা নেওয়ার পর দেহে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। প্রয়োজনে বুস্টার ডোজও নিতে হতে পারে। যদি হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই হেপাটাইটিস ডি-এর আক্রমণের কোনো সুযোগ থাকবে না।
দৈনন্দিন জীবনে আরও কিছু সতর্কতা মেনে চলা দরকার। কখনো অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ করা যাবে না। একবার ব্যবহৃত সিরিঞ্জ বা সুইয়ের পুনর্ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অন্যের ব্যবহৃত ব্লেড বা টুথব্রাশ ব্যবহার করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। সেলুনে গিয়ে শেভ করার সময় কর্মীকে বলে দিতে হবে যেন গ্রাহকের সামনেই নতুন ব্লেড পরিবর্তন করা হয়। খালি হাতে কারও ক্ষতস্থান স্পর্শ না করাই উত্তম। একইভাবে, অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক এড়িয়ে চলা এবং সঠিক পদ্ধতিতে কনডম ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে জন্ডিস দেখা দেওয়া, ক্ষুধামান্দ্য বা পেটে অস্বস্তি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু যখন ভাইরাসটি লিভারকে অকার্যকর করে ফেলে, তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। পেটে পানি জমতে শুরু করে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। লিভারের কার্যকারিতা নষ্ট হলে রক্তে অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে যেতে পারে। এর ফলশ্রুতিতে রোগীর জ্ঞানের স্তর কমে যায় এবং তিনি এলোমেলো আচরণ করতে থাকেন। এমন উপসর্গ দেখা দিলে অনেক সময় রোগীকে স্ট্রোক বা মস্তিষ্কের প্রদাহ ভেবে নিউরোমেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়। তাই প্রাথমিক অবস্থায় সঠিক রোগ নির্ণয় ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণই হতে পারে জীবন রক্ষার মূল চাবিকাঠি।



