কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি বিশ্ববাসীর সামনে এক গুরুতর নিরাপত্তা প্রশ্ন উত্থাপন করল। এআইয়ের ভবিষ্যৎ হুমকি নিয়ে দীর্ঘদিনের তাত্ত্বিক আলোচনা বাস্তবে রূপ নিয়েছে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআইয়ের একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষাধীন একটি নতুন এআই মডেল কর্তৃক জনপ্রিয় এআই সংগ্রহশালা হাগিং ফেস হ্যাক করার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, যা প্রযুক্তি শিল্পে গভীর বিভক্তি সৃষ্টি করেছে।

এ ঘটনা ঘিরে মূল বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এআই মডেলগুলোকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বা ওপেন সোর্স রাখা হবে, না কি কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে। গত সপ্তাহে ফাঁস হওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ওপেনএআইর নিরাপদ পরীক্ষাগার (অফলাইন স্যান্ডবক্স) ভেদ করে মডেলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইন্টারনেটে প্রবেশ করে। কোনোপ্রকার মানবীয় নির্দেশনা বা তত্ত্বাবধান ব্যতিরেকে এটি এক সম্পূর্ণ অভিনব সাইবার কৌশল প্রয়োগ করে হাগিং ফেসের নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এই সাইবার আক্রমণের বিষয়টি কয়েক দিন পর ওপেনএআইয়ের কর্মকর্তারা অবগত হন। এ ঘটনা এআই বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘকালীন আতঙ্ককে সত্যি করে এআই প্রযুক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ইঙ্গিতবহ বলে বিশেষজ্ঞ মহলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

এই অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় প্রযুক্তি জায়েন্টরা ওপেন সোর্স এআই-এর পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। এনভিডিয়া, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট এবং মেটা একজোট হয়ে ‘ওপেন সিকিউর এআই অ্যালায়েন্স’ নামের একটি জোট গঠন করেছে। তাদের প্রধান অভীষ্ট হলো, প্রতিরক্ষামূলক সাইবার নিরাপত্তা বলয়ের জন্য ওপেন সোর্স এআই টুল তৈরি করা। তবে এই জোট থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে এআই গবেষণার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক। হাগিং ফেস জানিয়েছে, তারা একটি চীনা উন্মুক্ত মডেলের কল্যাণেই এই অননুমোদিত প্রবেশ শনাক্ত করতে সমর্থ হয়েছে, কেননা কোনো আপাতবন্ধ বা ক্লোজড মডেল তাদের সাইবার তদন্তে সহায়তা করতে আগ্রহী হয়নি।
ওপেন সোর্সের যৌক্তিকতা তুলে ধরে এনভিডিয়া তাদের অবস্থান স্পস্ট করে বলেছে, যখন প্রতিরক্ষাকর্মীরা নিজস্ব অবকাঠামোতে উন্নত এআই পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনা করতে অক্ষম হন, তখন তাদের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসে। বিপরীতে, অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এক বিবৃতিতে মত প্রকাশ করেন যে, তিনি ওপেন সোর্স এআই নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী নন। তবে তার আশঙ্কা, অতিশক্তিশালী এআই মডেলগুলো অচিরেই সাইবার বা জৈব হামলার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। বাজারে কোনো শক্তিশালী এআই মডেল অবমুক্তির পূর্বে সরকারি ও স্বাধীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার জোর দাবি জানান তিনি। আমোদেই আরও উল্লেখ করেন, ওপেন মডেল ঝুঁকি বাড়ায় কি না এবং সেই ঝুঁকি প্রশমন সম্ভব কি না, তা আগেভাগে নিরুপণ করে তারপরই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত। যেহেতু ওপেন সোর্স মডেল ইন্টারনেটে একবার ছড়িয়ে পড়লে তা সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা অসম্ভব, তাই এই বিতর্ক এআই বিশ্বের ভবিষ্যৎ গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে অভিজ্ঞদের অভিমত।