বৈশ্বিক বন্ড বাজারে গত সপ্তাহে তীব্র বিক্রির কারণে ঋণের সুদের হার দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে ওয়াল স্ট্রিটে ঋণের উদ্বেগ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-য়ের উত্থানকে ছাড়িয়ে প্রধান আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর—এমনকি দশকের পর দশক ধরে—মার্কিন ঋণের ক্রমবর্ধমান গতিপথ নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও বিনিয়োগকারীরা তা উপেক্ষা করেছেন। কম ঋণের খরচের সুবিধায় শেয়ার বাজারে বিশাল লাভ হয়েছে, কিন্তু ঋণের স্তূপ আরও উঁচু হয়েছে, সুদের ব্যয় ফেডারেল বাজেটের বড় অংশ গ্রাস করেছে এবং ঘাটতি বেড়েই চলেছে। রেটিং সংস্থাগুলো মার্কিন ঋণের মান নামিয়ে দিয়েছে এবং বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ট্রেজারি কেনা কমিয়ে দিয়েছে। মার্কিন ডলার বিশ্বজুড়ে শীর্ষ সংরক্ষিত মুদ্রার মর্যাদা ধরে রেখেছে বলে এই পরিবর্তনের সঠিক সময়সীমা দীর্ঘদিন অস্পষ্ট ছিল।
আরএসএম-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ জোসেফ ব্রুসেলাস বুধবার একটি নোটে লিখেছেন, ঋণ কখন টেকসই হবে না, তা নির্ধারণ করে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার। তার মতে, এখন ঠিক তেমনই ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও জাপানের মতো শীর্ষ অর্থনীতিতেও ঋণের সুদ দ্রুত বেড়েছে। কোভিড মহামারির পর থেকে সরকারগুলো ঋণের খরচ এখনও সংকটকালীন নিম্ন স্তরে আছে—এমন ধারণায় ব্যয় চালিয়ে যাচ্ছে এবং অর্থনীতিতে এখনও জরুরি প্রণোদনার প্রয়োজন—এই যুক্তিতে ঘাটতিকে বাড়তে দিচ্ছে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুদের হার অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে, এআই খাত প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এমন একটি অর্থনীতিতে, যা উচ্চ হারের প্রতি ক্রমশ কম সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। পাশাপাশি, হাইপারস্কেলার কোম্পানিগুলো তাদের মূলধনী ব্যয়ের জন্য ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করছে, ফলে ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে বন্ড বাজারের ডলারের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো রবিন ব্রুকস মঙ্গলবার সাবস্ট্যাকে লিখেছেন, অনেক দেশের সরকারি ঋণ ইতিমধ্যে এত বেশি যে বাজারের ধৈর্য ফুরিয়ে যাওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন সেই মুহূর্ত এসে গেছে। ঋণের সুদ এত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে যে ট্রেজারি বিভাগ হঠাৎ দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের পুনঃক্রয় বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এই পদক্ষেপ সাময়িকভাবে সুদ কিছুটা কমালেও বাজারে তা আবার বেড়ে গেছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন এমন আর্থিক কৌশল ঋণের চাপকে দীর্ঘমেয়াদে ঠেকাতে পারবে না।
এই সংকটের নিকটবর্তী কারণ হিসেবে উচ্চ তেলের দামের প্রত্যাবর্তনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান অচলাবস্থার কারণে কূটনৈতিক অগ্রগতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, জ্বালানি ব্যয় দীর্ঘদিন উচ্চ থাকবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য করবে। কিন্তু ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির বিষয়ে নীতি নির্ধারকদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে—সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এই অনিশ্চয়তা বন্ডের সুদের ওপর আরও ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করেছে।
ব্রুসেলাস আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন—দুই পক্ষের অর্থনৈতিক জনতুষ্টিবাদ। বামপন্থী ধারায় এটি বেশি ব্যয়ের রূপ নেয়। ডানপন্থী ধারায় সাধারণত কর কমানোর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। উভয় ধারাই উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সহ্য করে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে প্রতিরোধ করে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এমন নীতি দীর্ঘদিন চলতে থাকে এবং সংশোধনের কোনো পথ না থাকে, তাহলে ব্যাংকিং ও মুদ্রা সংকটের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এই নীতির চূড়ান্ত ফলাফল ভালোভাবেই বুঝতে পারেন।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের বিশ্লেষকরা মঙ্গলবার একটি নোটে উল্লেখ করেছেন, বন্ড বিনিয়োগকারীরা এখন আর্থিক, ভূ-রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার জন্য বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। তাদের মতে, এই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তুলনায় বন্ড বিক্রির গতি ন্যায্য নয়, কিন্তু সরকারের ঘাটতি কমানোর কোনো ইঙ্গিত না দেওয়ায় বাজারের উদ্বেগ যুক্তিসঙ্গত। এর ফলে টার্ম প্রিমিয়াম—অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে একটি সম্পদ ধরে রাখার জন্য বিনিয়োগকারীরা যে অতিরিক্ত মুনাফা দাবি করেন—মূলত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা মৌলিকভাবে যৌক্তিক। ফলে টার্ম প্রিমিয়াম উচ্চ থাকবে এবং আগামী প্রান্তিকগুলোতে বন্ড বাজার নতুন অস্থিরতার মুখোমুখি হতে পারে বলে তারা পূর্বাভাস দিয়েছেন।




