দীর্ঘদিন পড়ালেখায় বিরতি পড়লেও কিংবা চাকরি ও সংসারের ব্যস্ততার মধ্যেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের পথ খুলে দিয়েছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে তিন লাখের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। গাজীপুরে অবস্থিত মূল ক্যাম্পাসের পাশাপাশি ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৬৩টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং প্রায় দেড় হাজার স্টাডি সেন্টারের মাধ্যমে সারাদেশে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বাউবির উপাচার্য মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান জানান, আর্থসামাজিক বাস্তবতা ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে প্রথাগত শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্যই মূলত এই বিশ্ববিদ্যালয়। শুরুতে এসএসসি ও এইচএসসি স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় মূলধারায় ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হলেও বর্তমানে সাত-আটটি বিষয়ে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। এমফিল ও পিএইচডি’র সুযোগও সম্প্রসারিত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম সাতটি স্কুলের অধীনে পরিচালিত হয়। স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আওতায় কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ও ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশনে সম্মান ডিগ্রি নেওয়া যায়। সিএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী কিন্তু নানা কারণে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বড় সিএসই ল্যাবে শিক্ষার্থীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা নিচ্ছেন। এ স্কুলে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মাস্টার অব পাবলিক হেলথ ও মাস্টার অব ডিজঅ্যাবিলিটি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডিগ্রিও চালু আছে।

শিক্ষক ও শিক্ষকতায় আগ্রহীদের জন্য স্কুল অব এডুকেশনে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) ও মাস্টার অব এডুকেশন (এমএড) প্রোগ্রাম চালু আছে, যার মেয়াদ এক বছর। মাদ্রাসাশিক্ষকদের জন্য রয়েছে ব্যাচেলর অব মাদ্রাসা এডুকেশন (বিএমইডি)। অন্যদিকে স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেস, হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজেসের অধীনে বিএ ও বিএসএস (সম্মান) এবং সাধারণ বিএ/বিএসএস প্রোগ্রাম রয়েছে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এমএ ও এমএসএস প্রোগ্রাম প্রিলিমিনারি ও ফাইনাল—এই দুই ধাপে সম্পন্ন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি করা হয় এবং জুম প্ল্যাটফর্মে অনলাইন ক্লাস পরিচালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি শিক্ষকেরাও এসব ক্লাসে যুক্ত হন।

ব্যবসায় শিক্ষার জন্য স্কুল অব বিজনেসে চার বছর মেয়াদি বিবিএ (বাংলা মাধ্যমে), দুই বছর মেয়াদি এমবিএ, প্রফেশনাল এমবিএ (পিএমবিএ) ও কমনওয়েলথ এক্সিকিউটিভ এমবিএ/এমপিএ প্রোগ্রাম রয়েছে। কৃষিশিক্ষায় আগ্রহীদের জন্য স্কুল অব অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্টে বিএসসিএজি অনার্স ও বিএজিএড ডিগ্রি নেওয়া যায়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কৃষিবিজ্ঞান, টেকসই কৃষি, অ্যাগ্রোনমি, এন্টোমোলজি, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, মৃত্তিকাবিজ্ঞান ও পোলট্রি সায়েন্সে মাস্টার্স করার সুযোগ আছে। আইন বিষয়ে স্কুল অব ল-এ চার বছর মেয়াদি এলএলবি ও মাস্টার অব ল প্রোগ্রাম চালু আছে, যা বর্তমানে ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে পড়ানো হয়।

খরচের দিক থেকে বাউবি তুলনামূলক সাশ্রয়ী। মাসিক বেতনের পরিবর্তে কোর্স ও সেমিস্টারভিত্তিক নির্দিষ্ট ফি একবার পরিশোধ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও গণসংযোগ বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন পাইক জানান, প্রোগ্রামভেদে ফি ভিন্ন হয়—এসএসসি-এইচএসসির মতো প্রোগ্রামে সবচেয়ে কম খরচ, আর এমবিএর মতো পেশাগত প্রোগ্রামে বেশি। বই সংগ্রহ, পরীক্ষা ফি ও আইডি কার্ডের জন্য আলাদা কোনো খরচ নেই। আর্থিকভাবে অসচ্ছল বা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ফি মওকুফের ব্যবস্থাও রয়েছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও সুযোগ রয়েছে। ‘বহির্বাংলাদেশ শিক্ষা প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, সৌদি আরব ও ইতালিতে বাউবির শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া ও ইউরোপের আরও দেশে স্টাডি সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। উপাচার্য আরও বলেন, বাউবির বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থী কাঠামো—প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণ থেকে শুরু করে চাকরিজীবী ও পেশাজীবী—সবাই এখানে উচ্চশিক্ষা ও পেশাদার দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছেন।