ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর বিদেশ সফরগুলোতে প্রায়শই বিভিন্ন সম্মাননা সংগ্রহ করে থাকেন, যা পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—এগুলোর প্রকৃত কূটনৈতিক মূল্য কতটুকু। ওয়েস্টমিনস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নিতাশা কাউল মনে করেন, এসব পুরস্কার ভারতের রাষ্ট্রীয় কূটনীতির প্রতিফলন নয়; বরং তা মোদির ব্যক্তিগত ইমেজ নির্মাণের হাতিয়ার।

সর্বশেষ গত ২৭ থেকে ২৯ জুন সেশেলস সফরে গিয়ে মোদি একটি অভূতপূর্ব পুরস্কার লাভ করেন। নাশপাতি আকৃতির নীল রঙের এই পুরস্কারটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন’ (নীল দিগন্তের অভিভাবক), যা বিশেষভাবে তাঁর জন্যই উদ্ভাবন করা হয়। সেশেলসের প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিক হারমিনি ভিক্টোরিয়ার স্টেট হাউসে এক জমকালো অনুষ্ঠানে এটি তুলে দেন। টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতায় নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে এই সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু পুরস্কারের প্রশংসাপত্রের ছবি প্রকাশ্যে এলে বিতর্ক দানা বাঁধে। তাতে দেশটির নাম ‘রিপাবলিক অব সেশেলস’-এর ইংরেজি বানান ভুল ছিল—‘Repubblic of Seycheeles’ লেখা হয়, যেখানে সঠিক বানান ‘Republic of Seychelles’। এই ভুলগুলোকে অধ্যাপক কাউল তাড়াহুড়ার ফল ও ‘উপহাস’ হিসেবে অভিহিত করেন। কংগ্রেস নেতা সুপ্রিয়া শ্রীনাতে ব্যঙ্গ করে বলেন, বিশ্ব মোদিকে চিনে ফেলেছে, আর পুরস্কার দিতে গিয়ে এত তাড়াহুড়া ছিল যে দেশের সরকারি নামই ভুল লেখা হয়েছে। পরে সেশেলসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা দেয়, ভাইরাল ছবিটি একটি ‘ওয়ার্কিং ড্রাফট’ বা খসড়া ছিল, প্রকৃত সনদ এটি নয়। তারা আরও জানায়, মোদির সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে দেশটির মন্ত্রিসভা এই নতুন পুরস্কার চালুর অনুমোদন দিয়েছিল।

১২ বছরের শাসনামলে মোদি ৩০টির বেশি আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। গত মঙ্গলবার ইন্দোনেশিয়া সফরে তাকে দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘বিনতাং আদিপূর্ণা’ দেওয়া হয়। গত জুনে স্লোভাকিয়া থেকে পান ‘অর্ডার অব দ্য হোয়াইট ডাবল ক্রস, ফার্স্ট ক্লাস’, যা বিদেশি নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত একটি জাতীয় সম্মাননা। ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল সফরে তিনি ‘স্পিকার অব দ্য নেসেট মেডেল’-এর প্রথম ও একমাত্র প্রাপক হন, যে পুরস্কারটি সফরের কিছুদিন আগে তৈরি করা হয়।

এর আগেও ২০১৮ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে যৌথভাবে জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার, ২০১৯ সালে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের ‘গ্লোবাল গোলকিপার অ্যাওয়ার্ড’, এবং ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং সামিটের ‘ফিলিপ কোটলার প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ পান মোদি। কোটলার পুরস্কারটি মোদির পর আর কোনো বিশ্ব নেতাকে দেওয়া হয়নি।

মোদি প্রায়ই বলেন, এই সম্মাননা শুধু তাঁর একার নয়, বরং তা ভারতের সম্মান। সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ নতুন পুরস্কার তৈরি করে ভারতের নেতাকে সম্মানিত করছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকেই তুলে ধরে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়ান হল এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, নয়াদিল্লি এগুলোকে ভারতের মর্যাদার প্রতিফলন হিসেবে দেখলেও, দেশের জন্য কোনো বাস্তব কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ভারতের স্বার্থ বাস্তবায়নের চেয়ে মোদি নিজের প্রচারেই বেশি মনোযোগী।

অধ্যাপক কাউল আরও মন্তব্য করেন, এই পুরস্কারগুলো মোদির একনায়কতান্ত্রিক রাজনীতির অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে, যা দিয়ে তাঁর সমর্থকেরা আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত এক রাষ্ট্রনায়কের রূপকথা নির্মাণ করছেন। তিনি বলেন, সেশেলসের ভুল বানানের ঘটনা একটি বড় উদাহরণ যে, দিন দিন এসব সম্মাননা সম্মানের বদলে উপহাসই বেশি কুড়াচ্ছে।