কাতার থেকে উপহার হিসেবে প্রাপ্ত বোয়িং ৭৪৭-৮ জেটে পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় তুরস্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে স্থানান্তরিত হতে হয়েছে। বুধবার মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শে আকস্মিকভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, কাতার আমিরের দেওয়া এই উড়োজাহাজে পূর্ববর্তী মডেলের ন্যায় কোনো উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রপ্রতিরোধী সক্ষমতা সংযোজন করা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, যে অঞ্চলে ইরানের মতো প্রতিপক্ষ সক্রিয়, সেখানে এ ধরনের ঘাটতি বিদেশ সফরকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ইরানের সীমান্তবর্তী তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে যোগদানের সময় এ সপ্তাহেই ইরানের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন হামলার ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

গত এক বছর ধরে মার্কিন বিমানবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাতারের দেওয়া এই উড়োজাহাজের সংস্কারকাজ চললেও, সময়স্বল্পতার কারণে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রেসিডেনশিয়াল বিমানের জন্য প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এতে যুক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা। বিমানবাহিনীর সাবেক সেক্রেটারি ফ্রাঙ্ক কেন্ডাল বলেন, “সময়স্বল্পতার কারণে একটি সাধারণ এয়ার ফোর্স ওয়ানের সব ধরনের পরিবর্তন এখানে করা সম্ভব হয়নি। তাই এর নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার ঘাটতি রয়ে গেছে।” তিনি বর্তমান ইরান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন এ উড়োজাহাজের ব্যবহার দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে তাপ অনুসরণকারী ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, যার অংশ ডানার নিচে ও লেজে বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান। নির্মাণাধীন নতুন বোয়িং জেটেও এ ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা থাকলেও, কাতার থেকে পাওয়া বিমানের ছবিতে এমন কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাননি বিশেষজ্ঞরা। এক সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

হোয়াইট হাউস অবশ্য নতুন উড়োজাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চ্যং এক বিবৃতিতে দাবি করেন, “নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান একটি অত্যাধুনিক আকাশযান। প্রেসিডেন্ট ও তাঁর কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এতে উচ্চস্তরের নিরাপত্তা প্রোটোকল যুক্ত করা হয়েছে।” মার্কিন বিমানবাহিনী এটিকে একটি অস্থায়ী ‘সেতু’ বিমান হিসেবে আখ্যা দিলেও, ১৯ জুনের বিবৃতিতে তারা স্বীকার করেছিল যে এতে সাধারণত একটি স্থায়ী এয়ার ফোর্স ওয়ানের সব সরঞ্জাম থাকে না।

ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের ঠিক আগের দিন, সিনেটের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা বিমানবাহিনীকে একটি চিঠিতে নতুন বিমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। সিনেটর ক্রিস্টোফার এস মারফির নেতৃত্বে ১৩ জন আইনপ্রণেতা অভিযোগ তোলেন, জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আরাম ও বিলাসিতাকেই এই সিদ্ধান্তে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২০ সালে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশের পর থেকেই ইরান ট্রাম্পকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। যদিও বর্তমান গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক কোনো হত্যা পরিকল্পনার প্রমাণ নেই, কারণ ইরান জানে এ ধরনের পদক্ষেপের পাল্টা জবাব কতটা ভয়াবহ হবে। তারপরও সিক্রেট সার্ভিসের উদ্বেগ এতটাই তীব্র ছিল যে তারা প্রেসিডেন্টকে দেশ ছাড়ার সময় উড়োজাহাজ বদলাতে বাধ্য করে। ট্রাম্প অবশ্য জনসমক্ষে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, পুরোনো বিমানে ফেরার কারণ হলো নতুন জেটটি আগেভাগে রওনা দিয়ে সামরিক ঘাঁটিতে প্রদর্শনীর সুযোগ পাওয়া।

হোয়াইট হাউসের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ভ্রমণকালে নিরাপত্তা প্রশ্নে সামরিক উপদেষ্টা ও সিক্রেট সার্ভিসের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের উত্তেজনা তৈরি হলেও, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ সাধারণত গৃহীত হয়। তবে কাতারের উপহারের বিমানে চড়ে ট্রাম্পের বিদেশ যাত্রা যে নিরাপত্তা প্রোটোকলের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরও কঠোর তদারকির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।