কানাডার কুইবেক প্রদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। প্রাদেশিক সংসদের ৪৪তম নির্বাচন আগামী ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে, এবং বিভিন্ন জনমত জরিপের ইঙ্গিত বলছে, স্বাধীনতাকামী ও রক্ষণশীল ধারার দল পার্টি কুইবেকোয়া (পিকিউ) বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর তুলনায় অগ্রগামী অবস্থানে আছে। দলটি তাদের পুরনো অভীষ্ট—একটি সার্বভৌম কুইবেক রাষ্ট্র গঠন—আবারও জোরালোভাবে প্রচারে নিয়ে এসেছে। পিকিউর নেতৃত্ব প্রচারণা চালাচ্ছেন যে, সরকার গঠন করতে পারলে তাঁরা কুইবেকের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণে একটি নতুন গণভোটের আয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন। এ কারণে পর্যবেক্ষকরা এবারের ভোটকে নিছক ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিযোগিতা না ভেবে প্রদেশটির সাংবিধানিক দিকনির্দেশনার একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি ভোটারদের মধ্যে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ফ্রাঙ্কোফোন জাতীয়তাবাদীদের একটি বড় অংশ একে স্বাগত জানালেও, সম্ভাব্য গণভোটের ইঙ্গিত অ্যাংলোফোন নাগরিকদের একটা অংশের মধ্যে শঙ্কা জাগিয়েছে। একইসাথে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরাও পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন, কেননা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতি ও বিনিয়োগের পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যদিও নির্বাচন আসন্ন, তারপরও সাধারণ মানুষের মাঝে এখনও তেমন দৃশ্যমান ভোটের আমেজ বা জোরালো প্রচার-প্রচারণার আবহ তৈরি হয়নি। তবে কানাডার নির্বাচনী সংস্কৃতি কিছুটা ভিন্ন ধরনের; রাস্তায় বা জনজীবনে বাহ্যিক কোনো লক্ষণ দেখে অনেক সময়ই বোঝা সম্ভব হয় না যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সমাগত। অন্যদিকে প্রধান দলগুলো আড়ালে থেকে নিজেদের নির্বাচনী কৌশল সুসংহত করছে। অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, গৃহায়ন সংকট এবং কুইবেকের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে নেতারা ভোটারদের আস্থা আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন। প্রচারণা যত এগোবে, ততই পরিষ্কার হবে কুইবেকের জনগণ নতুন করে গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতার প্রশ্নটি নিষ্পত্তি করতে চান, নাকি বিদ্যমান ফেডারেল কাঠামোর মধ্যেই তাদের অগ্রযাত্রা দেখতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এবারের লড়াই মূলত পিকিউ, কুইবেক লিবারেল পার্টি (পিএলকিউ) এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন কোয়ালিশন অ্যাভেনির কুইবেক (সিএকিউ)-এর মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতায় রূপ নেবে। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে, গত নির্বাচনে চতুর্থ স্থানে থাকা পিকিউ এখন শীর্ষে, অন্যদিকে সিএকিউ তৃতীয় অবস্থানে নেমে এসেছে। পিএলকিউ পিকিউর কাছাকাছি অবস্থানে থেকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ২০১৮ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা সিএকিউ একসময় প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে থাকলেও স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি এবং ভাষানীতি সংক্রান্ত বিতর্ক দলটির জনপ্রিয়তায় ভাটা ফেলেছে।
প্রতিযোগী তিন দলের নেতৃত্বে আছেন পিকিউর পল স্ট্যা পিয়েরে প্লামনডোন, পিএলকিউর পাবলো রদ্রিগেজ এবং সিএকিউর বর্তমান প্রিমিয়ার ক্রিস্টিন ফ্রেচেট্টি। কুইবেকের জাতীয় পরিষদে বর্তমান আসনবিন্যাস হলো সিএকিউ ৭৯, পিএলকিউ ১৮, কুইবেক সরিডায়ারা ১১, পিকিউ ৭ এবং অন্যান্য ও স্বতন্ত্র ১০টি আসন। সদ্যপ্রাক্তন প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগো ২০১১ সালে সিএকিউ প্রতিষ্ঠা করে ২০১৮ ও ২০২২ সালের নির্বাচনে দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নেতৃত্ব দেন। চলতি বছর জানুয়ারিতে তিনি পদত্যাগ করলে দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্বাচনে ক্রিস্টিন ফ্রেচেট্টি ৫৭.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং প্রদেশের ইতিহাসে দলটির প্রথম নারী নেতা ও প্রিমিয়ার হিসেবে নির্বাচনের আগে সিএকিউকে পুনরুজ্জীবিত করার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন। দলটি কুইবেক জাতীয়তাবাদ সমর্থন করলেও স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়।
এদিকে পিকিউ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রূপরেখা দিয়ে ৫২৪ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত নীলনকশা প্রকাশ করেছে। সেই দলিলে স্বাধীন কুইবেকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর পরিকল্পনা বর্ণিত হয়েছে এবং ক্ষমতায় এলে প্রথম মেয়াদের ভেতরেই তৃতীয় গণভোট আয়োজনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৯৮০ সালের ২০ মে তৎকালীন পিকিউ সরকারের প্রিমিয়ার রেনে লেভেস্ক কানাডার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখে কুইবেকের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রস্তাব দিলে গণভোটে ৪০.৪৪% 'হ্যাঁ' এবং ৫৯.৫৬% 'না' ভোটে সেটি নাকচ হয়। ১৯৯৫ সালের ৩০ অক্টোবর দ্বিতীয় গণভোটে প্রিমিয়ার জ্যাকুইস পারিজিউর নেতৃত্বাধীন সরকার সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তোলে; সেটি ছিল কানাডার ইতিহাসের সবচেয়ে নিকটতম লড়াই, যেখানে 'হ্যাঁ' পায় ৪৯.৪২% ও 'না' পায় ৫০.৫৮%—ব্যবধান মাত্র ৫৪,২৮৮ ভোট। সেই সময় কুইবেকের বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কায় মন্ট্রিয়ল থেকে বহু বড় করপোরেট অফিস অন্য প্রদেশে স্থায়ীভাবে সরে যায়।
এবারের নির্বাচনে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, পিকিউ ও সিএকিউর আপত্তির কারণে ইংরেজি ভাষায় নেতাদের কোনো বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে না। অন্যদিকে পিএলকিউ নেতা পাবলো রদ্রিগেজের নেতৃত্বে দলটি নিজেদের রাজনৈতিক ভিত পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ভাষা আইনের কঠোর প্রয়োগের পরিবর্তে শিক্ষা, ফ্রান্সাইজেশন ও অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফরাসি ভাষাকে শক্তিশালী করার নীতি তুলে ধরছে তারা। মন্ট্রিয়লসহ অভিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে লিবারেলদের ঐতিহ্যগত সমর্থন এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্যমতে, ২০২১ সালে কুইবেকের প্রায় ১৬ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ১৯.২%) নিয়মিত বা আংশিকভাবে ঘরে ইংরেজিতে কথা বলতেন, এবং নতুন অভিবাসনের ফলে ইংরেজিভাষীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে বলেও ধারণা করা হয়। প্রদেশের প্রায় ৮২% মানুষের মূল ভাষা ফরাসি হলেও তাদের একটি বড় অংশ স্বাধীনতা বা ভাষাগত কঠোর রক্ষণশীলতার পক্ষে নন।
কুইবেকের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার সরকার গঠন করেছে লিবারেল পার্টি (পিএলকিউ), আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চবার ক্ষমতায় এসেছে পিকিউ। নির্বাচনের তারিখ যত নিকটবর্তী হবে, সমীকরণও নানা মোড় নেবে। কুইবেকের বিচ্ছিন্নতাবাদ, ইংরেজি ভাষার ভবিষ্যৎ, অভিবাসন নীতি এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের মতো প্রশ্নগুলোর উত্তরই ঠিক করবে আগামী চার বছরের জন্য এই প্রদেশের রাজনৈতিক অভিমুখ। সবকিছু বিবেচনায়, কানাডার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল প্রদেশ কুইবেকের ২০২৬ সালের নির্বাচন সাম্প্রতিক কালের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সংবেদনশীল নির্বাচন হতে চলেছে।




