সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি বেশ কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ তুলে ধরা হচ্ছে। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, এই ভিডিওগুলোর অধিকাংশই পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার, যা ভুল তথ্য ও ভিন্ন পরিচয় দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
একটি ৩১ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, একটি দোকানের বেঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীকে পেছন থেকে লাকড়ি দিয়ে পিটিয়ে মারছেন এক ব্যক্তি। ভিডিওটি প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, কাঁচা তরকারির দোকানদার ওই নারীকে বাকি না দেওয়ায় বিএনপি নেতা নির্মম নির্যাতন করে দোকান থেকে বের করে দিয়েছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনাটি নোয়াখালী সদর উপজেলার হানিফ চেয়ারম্যান বাজারের, যেখানে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে মারধর করা হয়। ভিডিওতে দৃশ্যমান সাইনবোর্ডে জেএসডির নামের নিচে বাজারের ঠিকানা লেখা থাকলেও, নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচয় পাওয়া যায় আবুল খায়ের নামের এক চা-দোকানদারের। তিনি জেএসডি'র সদর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হলেও তার সাথে বিএনপির কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই বলে জানা গেছে।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে আবুল খায়ের জানান, ওই নারী মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং প্রায় ১৫ দিন ধরে বাজার এলাকায় ঘোরাফেরা করছিলেন। ঘটনার দিন বৃষ্টির মধ্যে তিনি দোকানে ঢুকে লাকড়ি দিয়ে চায়ের ফ্লাস্ক ও অন্যান্য জিনিসপত্র ভাঙচুর করলে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি তাকে মারধর করেন। পরে নিজের আচরণের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তিনি ওই নারী ও স্থানীয়দের কাছে ক্ষমাও চান। বাজারের ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নারীটি প্রথমে দোকানে ক্ষতি করছিলেন, পরে আবুল খায়ের তাকে মারধর করেন। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, মানসিকভাবে অসুস্থ একজনকে এভাবে মারধর করা ঠিক হয়নি, তবে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে রাজনৈতিক দলের নাম জুড়ে দেওয়াও অনুচিত।
একই ধরনের আরেকটি ঘটনায়, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের ছোট ভাইকে ধানমন্ডিতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দেখিয়ে একটি ছবি ও ভিডিও ছড়ানো হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, আটক ওই যুবকটি সারজিস আলমের ভাই নন এবং ঘটনাটিও ঢাকার ধানমন্ডিতে নয়। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আবদুর রহমান ওরফে রাহিম নামের এক যুবককে অস্ত্রসহ আটকের ছবিকে ভিন্ন দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে। গত ৮ জুন প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনের ছবির সাথে প্রচারিত ছবির হুবহু মিল পাওয়া গেছে।
এছাড়া, আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রীকে নির্যাতনের দাবিতে ছড়ানো একটি ভিডিও প্রকৃতপক্ষে কক্সবাজারের চকরিয়ায় অপহরণের শিকার এক কিশোরীকে উদ্ধারের সময় পুলিশের মারধরের ঘটনা। অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগে ওই ঘটনায় এসআই মো. আরকানুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের দাবিতে প্রচারিত সন্তানের সামনে বাবাকে হত্যার ভিডিওটি বাংলাদেশের নয়, বরং গত বছর ভারতের বিহারে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সংঘটিত একটি ঘটনার।
এই সব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত অ্যাকাউন্টগুলো থেকে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ভুয়া অভিযোগ তুলে ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা যাচাই না করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব ভিডিও ছড়ানো হলে তা সামাজিক সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক পরিবেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।




