পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার বড়থলি ইউনিয়নটি বর্তমানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার চরম সংকটে ভুগছে। ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত দুর্গম এই ইউনিয়নটি একদিকে ভারতের মিজোরাম এবং অন্যদিকে মিয়ানমারের চিন রাজ্য দ্বারা পরিবেষ্টিত। পাহাড় ও ঘন বনে ঘেরা এই এলাকায় বসবাস করেন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ, যারা মূলত তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমী ও ম্রো জনগোষ্ঠীর। তাদের প্রধান জীবিকা হলো পাহাড়ের জুমচাষ। খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এই বাসিন্দাদের জন্য এলাকায় ১০টি গির্জা এবং দুটি বৌদ্ধবিহার থাকলেও অন্যান্য নাগরিক সেবার মান অত্যন্ত নিম্ন।

বড়থলি ইউনিয়নের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। পুরো ইউনিয়নে ৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। ফলে পঞ্চম শ্রেণির পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে অন্য ইউনিয়নের স্কুলে পড়তে গেলেও বর্ষাকালে পাহাড়ি ঝরনা ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়ে। পলথনপাড়ার কারবারি মতি ত্রিপুরা জানান, বর্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুদের স্কুলে পাঠানো যায় না, যার ফলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবার জন্য কোনো কার্যকর কেন্দ্র নেই; একটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলে স্থানীয়দের অনেক উপকার হতো বলে মনে করেন তারা।

যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে, এই ইউনিয়নটি রাইখ্যং হ্রদের তীরে অবস্থিত। স্থানীয়দের মতে, এই হ্রদটিই তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অন্যতম কারণ। এলাকাটিতে কোনো স্থায়ী বাজার নেই এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধা নেই বললেই চলে। নাগরিক সেবা পেতে হলে বাসিন্দাদের দুর্গম পাহাড় ডিঙিয়ে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে পৌঁছাতে যেখানে প্রায় দুই দিন সময় লাগে, সেখানে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় যেতে সময় লাগে এক দিন। ফলে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য বাসিন্দাদের প্রায় ২৭ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হয়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়টি তাদের নিজস্ব জেলায় নয়, বরং ২৭ কিলোমিটার দূরে অন্য জেলায় অবস্থিত। ইউপি চেয়ারম্যান জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ২ হাজার ১০০ ভোটারের এই ইউনিয়নে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সেবা নিতে বা দিতে এবং কেনাকাটা করতে যাতায়াতেই বাসিন্দাদের দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমাও এই চরম দুর্গমতা ও দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করেছেন।

এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন জানান, এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজ করার জন্য বান্দরবানের রুমা উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয় রাখা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেখানে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হলেও শিক্ষার্থী সংকট এবং দুর্গমতার কারণে বর্তমানে এর কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।