বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বেশ কয়েকটি নদীতে একটি সংঘঠিত চক্র বাঁশের তৈরি বিশাল চাঁই ফেলে নির্বিচারে পাঙাশের পোনা নিধন করছে। সন্ধ্যার অন্ধকারে নদীর ৪০ থেকে ৫০ ফুট গভীরে ডুবিয়ে দেওয়া হয় এই ফাঁদ। ছয় ঘণ্টা পর তা তুলে আনা হলে হাজার হাজার পাঙাশের পোনা ওঠে, যা পরবর্তীতে বাজারে 'নদীর ট্যাংরাভাষ' নামে চালিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী, আড়তদার, মৎস্য ব্যবসায়ী ও জেলেরা এই চক্রের সাথে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মৎস্য বিভাগের ভাষ্যমতে, হোয়াটসঅ্যাপের 'লাইভ লোকেশন' ফিচারের সাহায্যে পানির তলায় ফাঁদের অবস্থান সংরক্ষণ করা হয়, যা উদ্ধার অভিযানকে আরও কঠিন করে তোলে। সন্ধ্যার পর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদীর গভীরে ফেলা এসব চাঁই এতটাই গভীরে থাকে যে, কয়েক ঘণ্টা ধরে অনুসন্ধান করেও অনেক সময় এর হদিস মেলে না। স্থানীয় সূত্রের ভিত্তিতে মাঝেমধ্যে দু-একটি চাঁই জব্দ করা গেলেও, এর সাথে জড়িতদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা দুষ্কর হওয়ায় চক্রটি নির্ভিগ্নে তার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
গবেষণা ও মৎস্য সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, দেশের সর্ববৃহৎ মৎস্য অভয়াশ্রম মেঘনা। এর বাইরেও বরগুনার বিষখালী-বলেশ্বর-পায়রা মোহনা, তেঁতুলিয়া, মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ এবং সুগন্ধার মতো নদনদীগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে এই নিধন চলছে। পাঙাশের প্রধান প্রজনন সময় মে থেকে সেপ্টেম্বর হলেও এখন প্রায় সারা বছর ধরেই চাঁই পেতে পোনা ধরা হচ্ছে। এতে নদীর প্রাকৃতিক পাঙাশের ভান্ডার ভীষণ হুমকির মুখে পড়েছে।
বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি প্রতিটি অতিকায় চাঁইয়ের দাম পড়ে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। ভোলার মৎস্য ব্যবসায়ীদের মতে, বাউফল ছাড়াও মনপুরা, চরফ্যাশন ও মুন্সিগঞ্জে এসব তৈরি হচ্ছে। নদীতে ফেলার আগে প্রতিটি চাঁইয়ের ভিতরে রাখা হয় শুঁটকি, খৈল, কুঁড়া, চিনি, চিড়া ও মাছের তেলের মণ্ড। জোয়ারের স্রোতে ভেসে আসা পাঙাশের পোনা এই টোপে আকৃষ্ট হয়ে ফাঁদে আটকা পড়ে। একজন স্থানীয় জেলে জানান, প্রতিটি চাঁই এতই বড় যে এর ভিতরে দুই থেকে তিনজন মানুষ স্বচ্ছন্দে ঢুকতে পারেন এবং প্রতি চাঁড়ে আড়াই থেকে তিন মণ পর্যন্ত মাছ ধরা পড়ে।
গত ২০ জুলাই বরগুনার পাথরঘাটায় বলেশ্বর নদের তীর থেকে স্থানীয়রা চারটি বিশাল চাঁড় জব্দ করে, যা পরে কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগ পুরিয়ে ধ্বংস করে। এর আগে গত ১ মে তালতলীর পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর মোহনা থেকে দুটি চাঁই উদ্ধার করে নৌ পুলিশ এবং বাউফলের দুই জেলেকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। কোস্টগার্ডের পাথরঘাটা স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার রফিকুল ইসলাম জানান, অবৈধ চাঁড় ও ছোট ফাঁসের জালের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে।
বরিশাল নগরের পোর্ট রোড, বাংলাবাজার ও চৌমাথার বাজারে ৩ থেকে ৭ ইঞ্চি আকারের এই পোনা প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মৎস্য কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রকৃত ট্যাংরা একটি ভিন্ন ক্যাটফিশ প্রজাতি, কিন্তু পাঙাশের পোনাকেই 'পাঙাশ-ট্যাংরা' বা 'নদীর ট্যাংরা' বলে বাজারজাত করা হচ্ছে। অনেক বিক্রেতাও পোনা ও ট্যাংরার মধ্যে প্রজাতিগত তফাৎ জানেন না।
২০১৭ সালে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় পাঙাশের ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়। ২০১৯ সালে আরও কিছু বিচরণক্ষেত্র শনাক্ত করা হয়, যার মধ্যে মেহেন্দীগঞ্জের নলবুনিয়াসংলগ্ন মেঘনা, সুগন্ধা ও বিষখালীর কিলমেঘা অন্তর্ভুক্ত। ওই গবেষণাতেই উঠে আসে যে মাত্র ২০ জন জেলেসা প্রতিদিন চাঁই ব্যবহার করে গড়ে ১২০ কেজি পোনা ধরছেন, যা থেকে ছয় মাসে কমপক্ষে দুই কোটি পোনা নিধনের কথা জানা যায়। মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় জেলেদের ধারণা, বর্তমানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ এবং অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ এই অবৈধ পদ্ধতির সাথে যুক্ত।
গবেষণার নেতৃত্বে থাকা সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী সতর্ক করে বলেন, ২০১৪ সালের পর ইকোফিশ ও মৎস্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশের প্রজননও বাড়ছিল। কিন্তু এখনকার মতো পোনা নিধন অব্যাহত থাকলে প্রজাতিটি পুনরায় হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং এর প্রজনন ও উৎপাদন নেমে যেতে পারে তলানীতে। বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান চাঁইকে মাছের বংশবিস্তারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর উল্লেখ করে বিশেষ নজরদারির নির্দেশনার কথা জানালেও, এ বছর মোট কতগুলো চাঁই জব্দ হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা তাৎক্ষণিক ভাবে জানাতে পারেননি।



