বাজারে বরফের স্তূপে সাজানো লাল কোরাল মাছের টকটকে লাল রং দেখে আমরা মুগ্ধ হই, কিন্তু এই রঙের রহস্য লুকিয়ে আছে সমুদ্রের অন্ধকার তলদেশে। এই মাছ অগভীর জলের বাসিন্দা নয়, বরং বঙ্গোপসাগরের পাথুরে এবং গভীর তলদেশে বাস করে। সাধারণত সমুদ্রের মহীসোপানের ৩০ থেকে ২০০ ফুট গভীরে, ডুবো টিলা ও পাথুরে ধ্বংসাবশেষের মাঝে এদের দেখা মেলে। শরীরজুড়ে গোলাপি-লাল আভা, পিঠের গাঢ় রং এবং চোখের উজ্জ্বল লাল মণি এই মাছের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই লাল রং মাছটি নিজে তৈরি করতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে কোনো মেরুদণ্ডী প্রাণীই এই রঞ্জক পদার্থ তৈরি করতে সক্ষম নয়। এই রঙের মূল উৎস হলো 'ক্যারোটিনয়েড' নামক এক ধরণের রঞ্জক, বিশেষ করে 'অ্যাস্টাক্সানথিন' নামক একটি যৌগ। লাল কোরাল যখন চিংড়ি বা খোলসযুক্ত ছোট ক্রাস্টেশিয়ান প্রাণী শিকার করে খায়, তখন ওই খাবার থেকে এই যৌগটি তাদের শরীরে জমা হতে থাকে। ফলে চামড়া, আঁশ এবং এমনকি চোখের মণিতেও রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে। একই কারণে স্যামন মাছ বা ফ্ল্যামিঙ্গো পাখির শরীর গোলাপি হয়ে থাকে।
তবে প্রশ্ন জাগে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেখানে এমন উজ্জ্বল লাল রঙের প্রয়োজনীয়তা কী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানে। পানির নিচে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে দীর্ঘ হওয়ায় এটি খুব দ্রুত শোষিত হয়ে যায়; মাত্র ১০-১২ মিটার গভীরে গেলেই লাল আলো প্রায় বিলীন হয়ে যায়। ফলে গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে লাল রঙের কোনো প্রতিফলন ঘটে না। শিকারির চোখে এই মাছটিকে লাল মনে না হয়ে বরং ধূসর বা কালো ছায়ার মতো দেখায়, যা পাথুরে পরিবেশের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক চমৎকার ছদ্মবেশ তৈরি করে। অর্থাৎ, যা উপরিভাগে উজ্জ্বল লাল, গভীর জলে তা-ই হয়ে ওঠে জীবন রক্ষাকারী গোপন পোশাক।
বাণিজ্যিক মাছ চাষের ক্ষেত্রে এই রঙের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খামারের খাঁচায় বন্দী লাল কোরাল যদি প্রাকৃতিকভাবে চিংড়ি বা খোলসযুক্ত প্রাণী খেতে না পারে, তবে তার শরীরের লাল রং ম্লান হয়ে সাদাটে হয়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানে অনেক হ্যাচারি এখন মাছের খাবারে কৃত্রিমভাবে অ্যাস্টাক্সানথিন মিশিয়ে দেয়। চীনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই সম্পূরক খাবার শুধু রঙের উজ্জ্বলতা বাড়ায় না, বরং মাছের লিভারের এনজাইমের সক্রিয়তা এবং বৃদ্ধির হারও ত্বরান্বিত করে। বাজারে বন্য ও খামারের মাছের দামের পার্থক্যের একটি বড় কারণ হলো এই রঙের উজ্জ্বলতা, কারণ ক্রেতারা স্বাদের আগে রঙের দিকে নজর দেন।
আসল লাল কোরাল চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো এর চোখের মণির দিকে তাকানো। প্রকৃত লাল কোরালের চোখ রক্তবর্ণের হয়ে থাকে, যা বাজারে অন্য প্রজাতির মাছের সঙ্গে এটিকে আলাদা করতে সাহায্য করে।Такимভাবে, একটি লাল কোরাল মাছের শরীর আসলে তার খাদ্যাভ্যাস, বাসস্থানের গভীরতা এবং টিকে থাকার লড়াইয়ের এক জটিল বাস্তুসংস্থানের প্রতিফলন।




