পাকা কিংবা কাঁচা পেঁপে খাওয়ার সময় আমরা সাধারণত এর ভেতরের ছোট ছোট কালো বিচিগুলো ফেলে দিই। অথচ এই পরিত্যক্ত অংশটিও ভোজ্য এবং বেশ পুষ্টিকর। এসব বিচিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যআঁশ, উপকারী মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ফ্ল্যাভোনয়েড ও পলিফেনলের মতো প্রয়োজনীয় উদ্ভিজ্জ যৌগ। শরীরের জন্য বিভিন্ন দিক থেকে উপকারী হলেও এটা অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়া মোটেই উচিত হবে না। তাই খাদ্যতালিকায় এই উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার আগে এর পুষ্টিমূল্য, স্বাস্থ্যগত সুবিধা এবং কিছু সতর্কতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার।

পেঁপের বিচির পুষ্টি উপাদানগুলোর মধ্যে শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পলিফেনল ও ফ্ল্যাভোনল উল্লেখযোগ্য। এগুলো দেহের কোষগুলোকে ফ্রি র্যাডিক্যালের ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে রক্ষা করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন’-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ওলিক অ্যাসিডের মতো মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ এই বিচি টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ ১৯ শতাংশ ও ভিএলডিএল কোলেস্টেরলের পরিমাণ ২২ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এছাড়া, এটি খাদ্যআঁশের একটি চমৎকার উৎস হিসেবে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে এবং হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকি কমাতে অবদান রাখতে পারে।

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সম্ভাব্য কার্যকারিতা
বিভিন্ন গবেষণার আলোকে দেখা গেছে, পেঁপের বিচির কিছু নির্দিষ্ট উপকারী গুণ আছে। এটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে’ প্রকাশিত এক গবেষণায় তথ্যমতে, পেঁপের বীজ কয়েক প্রকারের ছত্রাক ও পরজীবী ধ্বংস করতে পারে। অপর একটি পর্যবেক্ষণে জানা যায়, শুকনা পেঁপের বিচি ও মধুর মিশ্রণে তৈরি পানীয় পেটের পরজীবী দমনে প্লাসিবোর চেয়ে বেশি কার্যকর। তবে এই গুণ কতটুকু কাজে দেয়, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও ব্যাপক পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।

পাশাপাশি, কিডনির সুরক্ষণার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা আছে। গবেষণার তথ্য মতে, পেঁপের বিচিতে বিদ্যমান ফাইটোকেমিক্যালগুলি কিডনিকে রক্ষা করতে এবং প্যারাসিটামোলের কারণে কিডনির যে ক্ষতি হয়, তা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। যদিও এটি প্রাণীর ওপর চালানো একটি গবেষণা। মানুষের ক্ষেত্রেও এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গভীর অনুসন্ধান দরকার। তদুপরি, পরীক্ষাগারে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে পেঁপের বিচির নির্যাস প্রদাহ হ্রাস করে ও ক্যানসার কোষের বৃদ্ধির গতি মন্থর করতে পারে। প্রোস্টেট ক্যানসারের কোষের বিস্তার কমার ঘটনাও একটি গবেষণায় ধরা পড়েছে।

হজম প্রক্রিয়ার উন্নতিতেও পেঁপের বিচি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। খাদ্যআঁশের ভালো উৎস হিসেবে এটি মল কোমল রাখতে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত আঁশ অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগের ঝুঁকি কমানো, অর্শের উপসর্গ হ্রাস এবং অন্ত্রে আলসারের আশঙ্কা কমাতেও কার্যকর।

সতর্কতা ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
যেকোনো ভালো জিনিসেরই একটি সীমা আছে। পেঁপের বিচি অতিরিক্ত সেবন করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর হতে পারে। প্রাণীর ওপর করা কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, উচ্চ মাত্রার পেঁপের বিচির নির্যাস পুরুষদের শুক্রাণুর পরিমাণ ও গতিশীলতা কমিয়ে দিতে সক্ষম। পাশাপাশি, বিচিতে থাকা ‘বেনজিল আইসোথায়োসায়ানেট’ নামক এক উপাদান অতিমাত্রায় দেহে গেলে কোষ ও ডিএনএর ক্ষতি করতে পারে। তবে স্বাভাবিক মাত্রায় পেঁপের বিচি খাওয়ায় মানুষের জন্য এমন ঝুঁকির পক্ষে এখনো কোনো জোরালো প্রমাণ মেলেনি। গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি বিশেষভাবে নিরাস্য, কেননা অতিরিক্ত পেঁপের বীজ গর্ভনিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, পেঁপের বিচি নিঃসন্দেহে পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং এর উপাদানগুলি সংক্রমণ রোধ, কিডনি সুস্থতা, হজম প্রক্রিয়ার উন্নতি ও ক্যানসার প্রতিরোধের মতো ক্ষেত্রগুলোতে আশাব্যঞ্জক ভূমিকা দেখাতে পারে। কিন্তু এর বেশিরভাগ উপকারিতাই এখনও পরীক্ষাগারের গবেষণার উপর দাঁড়িয়ে। একইসঙ্গে, অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়ার কিছু অপকারিতাও আছে। সুতরাং, একে পরিমিত মাত্রায় খাদ্যতালিকায় রাখাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।