শ্রাবণের এক বিকেলে নিজ গ্রাম থেকে মাত্র বিশ কিলোমিটার দূরের চলনবিলে গিয়ে লেখক এক চিরন্তন সত্য উপলব্ধি করেন—সৌন্দর্য খোঁজার জন্য দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, অনেক সময় নিজের দৃষ্টির সীমানার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে পরম প্রশান্তি। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলা তার জন্মস্থান হলেও বর্ষার ভরা মৌসুমে কখনও চলনবিল দেখার সুযোগ হয়নি।
স্থানীয় শুভাকাক্সক্ষী উজ্জ্বল মাহাতোর উৎফুল্ল আহ্বানে এবং কয়েকজন সাংবাদিকের ব্যবস্থাপনায় এক শুক্রবার বিকেলে নিমগাছি বাজার থেকে সিএনজি অটোরিকশায় যাত্রা শুরু হয়। তাড়াশ থেকে একজন সাংবাদিককে নিয়ে তারা পৌঁছান কামারশোন গ্রামে। কামারশোন ঘাট থেকে কুন্দইইলের উদ্দেশ্যে নৌকা ছাড়ার সময় থইথই জলরাশি ও ডুবে থাকা পাকা সড়ক এক কাল্পনিক সমুদ্রপথের অনুভূতি জাগায়। তরুণদের মোটরসাইকেল চালনা সেই রোমাঞ্চকে বাড়িয়ে তোলে।
কুন্দইল সেতুতে পৌঁছে দৃশ্যপট ছিল এক বর্ণিল উৎসবের। সারি সারি নৌকা, মাঝিদের ডাক, সেতুর রেলিং থেকে তরুণদের জলে ঝাঁপ দেওয়া, রঙিন শাড়ি পরে জলে হাঁটা, আর ফোনে ছবি তোলার দৃশ্য—সব মিলিয়ে এক মুখরিত মিলনমেলা। কাঠের ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে যাতায়াতের পথে অনেক নৌকায় ভারী বাদ্যযন্ত্রও চোখে পড়ে।
চলনবিলের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্বও বিশাল। পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জের ৮টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নে বিস্তৃত এটি দেশের সবচেয়ে বড় জলাভূমি। বর্ষায় এর আয়তন প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার হয়। জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুর থেকে পতিসর যাওয়ার সময় আত্রাই নদীপথে চলনবিল ব্যবহার করতেন এবং নৌকায় ভেসে যেতে যেতে এখানেই রচিত হয়েছিল তাঁর বহু কালজয়ী রচনা।
সড়ক অববকাঠামোর উন্নতির ফলে বর্তমানে তাড়াস থেকে কুন্দইল পর্যন্ত পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। আষাঢ় থেকে আশ্বিন পর্যন্ত চার মাস বিলের পাড়ে গড়ে ওঠা ভাজাপোড়া, চা-বিস্কুট, স্থানীয় চাটনি ও মিষ্টির দোকানগুলো মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাঝি, চালক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবিকার গতি দিয়েছে। ব্যস্ত নাগরিক ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে এই প্রকৃতি কাননের প্রতি মানুষের ব্যাকুলতা প্রমাণ করে যে, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো গড়তে পারলে চলনবিল উত্তরবঙ্গের অন্যতম অর্থনৈতিক ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।




