২০২২ সালের এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বুরকিনা ফাসোর ক্ষমতায় আসা ৩৮ বছর বয়সী সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে এখন আফ্রিকার অন্যতম আলোচিত নেতা। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে সার্বভৌমত্ব ও বিদেশি প্রভাব মোকাবিলার প্রতীক হিসেবে দেখেন, কিন্তু তাঁর শাসনামলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ বেড়েছে এবং নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি। গত এপ্রিলে ত্রাওরে বুরকিনা ফাসোর জনগণকে ‘গণতন্ত্রের কথা ভুলে যেতে’ বলেন, যুক্তি দিয়ে বলেন দেশটি এখন বিপ্লবী স্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, গণতান্ত্রিক নয়। এর আগে তাঁর সরকার সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত ঘোষণা করে, যা ইঙ্গিত দেয় বেসামরিক শাসনে ফেরার ইচ্ছা তাঁর নেই।
ত্রাওরের জনপ্রিয়তা কেবল বুরকিনা ফাসোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; পুরো আফ্রিকায় তিনি প্রশংসিত। তিনি ফরাসি সেনাদের দেশ থেকে বের করে দেন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং স্থানীয় শিল্প ও কৃষির প্রসারে উদ্যোগ নেন। সাবেক বিপ্লবী নেতা টমাস সানকারার আদর্শের কথা তুলে ধরে তিনি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। নাইজেরিয়াভিত্তিক নিরাপত্তাবিশ্লেষক কবির আদামু আল-জাজিরাকে বলেন, ‘বুরকিনা ফাসোতে যা ঘটছে, তা মূলত বৈধতার সঙ্গে কাজের সাফল্যের এক অদ্ভুত বিচ্ছেদ।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ত্রাওরে ‘স্বদেশ প্রতিরক্ষায় স্বেচ্ছাসেবক’ বাহিনী গঠন, ইকোয়াস জোট থেকে বেরিয়ে আসা এবং রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের ক্লান্তি ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ত্রাওরের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সেনাবাহিনী দেশজুড়ে অভিযান জোরদার করে বিভিন্ন শহর ও কৌশলগত অবস্থান পুনরুদ্ধারের দাবি করলেও, স্বাধীন যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত। ঘানার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মুস্তাফা বাতুরে সাল্লামা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘নিরাপত্তার উন্নতি হয়েছে কি না, শেষ পর্যন্ত এর ওপর ভিত্তি করেই ত্রাওরের শাসনকে মূল্যায়ন করা হবে।’ বুরকিনা ফাসো এখনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি; লাখ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন এবং ২০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত।
রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গত জানুয়ারিতে কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো বিলুপ্ত করে এবং সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করে। সম্প্রতি পাস হওয়া ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন’-এর আওতায় কয়েকজন বিশিষ্ট সুন্নি আলেমকে গ্রেপ্তার করা হয়। ত্রাওরে ঘোষণা দেন, ধর্মীয় চরমপন্থা উসকে দেওয়ার অভিযোগে মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ‘লড়াই শুরু হয়েছে’। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
উয়াগাদুগুর এক যুবনেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এমন এক নেতাকে দেখে গর্ববোধ করি, যিনি পশ্চিমাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেন এবং আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন। কিন্তু কেবল গর্ব তো আর একটি পরিবারকে খাওয়াতে পারে না। আমরা চাই ক্যাপ্টেন ত্রাওরে যেমন শক্তির প্রতীক হয়ে থাকুন, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারেরও প্রতীক হয়ে উঠুন।’ সার্বভৌমত্বকে রাজনৈতিক বার্তায় পরিণত করতে ত্রাওরে সফল হলেও, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, মানবিক সংকট ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার মতো বাস্তব চ্যালেঞ্জ এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।



