ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা ইউনিয়নের উজান ভাটিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জোসনারা বেগমের একটাই আকুতি— তাঁর ছেলে শাহরিয়ার সুমনকে (৩৮) যেন জীবিত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। বারবার চোখের পানি মুছে তিনি বলেন, অভাবের তাড়নায় বিদেশে গিয়েছিলেন তাঁর ছেলে, কিন্তু দালালের প্রতারণার শিকার হয়ে আজ তাঁর এই দশা। গত শনিবার (১ আগস্ট) দুপুরে জোসনারা বেগমের সাথে কথা হলে তিনি এই কথাগুলো বলেন। এর কিছুক্ষণ পর বাড়ির পাশের মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে ফিরে আসেন শাহরিয়ারের বাবা ওয়াজেদ আলী। ছেলের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য জমি বিক্রি করতে হয়েছে, বড় ছেলেও ঋণ নিয়ে টাকা জোগাড় করেছে। পরিবারের ধারণা ছিল, ছেলে বিদেশে গিয়ে কাজ করে সংসারের অভাব দূর করবে। কিন্তু রাশিয়া যাওয়ার পর দালালেরা তাকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে যুদ্ধে পাঠিয়ে দেয়। ওয়াজেদ আলী বলেন, এই পরিস্থিতি আগে জানলে ছেলেকে কখনো বিদেশে যেতে দিতেন না। এখন তাঁর একমাত্র চাওয়া—সরকার যেন কূটনৈতিক উদ্যোগে ছেলেকে বাঁচিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনে। কয়েক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত এই দম্পতি ধরে নিয়েছিলেন, তাঁদের ছেলে আর বেঁচে নেই। গত ২০ জুন স্বজনদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পেরেছিলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় শাহরিয়ার নিহত হয়েছেন। সেই শোক পুরোপুরি কাটার আগেই কয়েক দিন আগে ইউক্রেনের একটি কারাগার থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে ছেলেকে জীবিত দেখতে পান। এরপর থেকেই তাঁদের একমাত্র প্রার্থনা—ছেলেটি যেন জীবিত দেশে ফিরে আসে।

শাহরিয়ার সুমন ঢাকায় একটি পোশাক প্রতিষ্ঠানে দর্জির কাটিং মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন। আয় দিয়ে কোনোমতে সংসার চললেও অভাব কাটছিল না। দুই স্ত্রী, তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। পরিবারের সদস্যরা জানান, গত বছরের ৫ জুন বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় রাশিয়ায় যান শাহরিয়ার। বিদেশে পাঠাতে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়। সেই টাকা জোগাড় করতে জমি বিক্রি, ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। বিদেশ যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, কয়েক বছর কষ্ট করলেই ঋণ শোধ হবে, সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করা যাবে। গত ২৪ এপ্রিল পরিবারের সঙ্গে শাহরিয়ারের সর্বশেষ কথা হয়। এরপর তাঁর কোনো খোঁজ ছিল না।

রাশিয়ায় গিয়ে একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন শাহরিয়ার। বাংলাদেশে থাকতেই তিন মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ছয় মাসের মাথায় প্রতিষ্ঠানটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানি দেশে ফেরার টিকিট দিলেও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ফিরতে চাননি তিনি। তখনই শুরু হয় দুর্ভাগ্যের নতুন অধ্যায়। পরিবারের ভাষ্য, মস্কোতে এক দালাল প্রথমে আঙুরবাগানে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁকে নিয়ে যায়। পরে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে শাহরিয়ার ও তাঁর এক বাংলাদেশি সঙ্গীর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেয়। এরপর রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়, যার অর্থ তাঁরা বুঝতেই পারেননি। পরে জানতে পারেন, তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন শাহরিয়ার। কিন্তু নানা চাপের মুখে তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ও পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

ইউক্রেনের কারাগার থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে শাহরিয়ার নিজের মুখেই ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি জানান, মাত্র তিন দিনের সামরিক প্রশিক্ষণের পর তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। কয়েক দিন পর আরেকটি অভিযানে পাঠানোর কথা থাকলেও তিনি ও তাঁর বাংলাদেশি বন্ধু কামরুল হাসান পালিয়ে ইউক্রেনের দিকে চলে যান। কিন্তু সীমান্ত পার হওয়ার পরই ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর হাতে আটক হন। এর পর থেকে তাঁরা ইউক্রেনের একটি কারাগারে বন্দী। ভিডিও বার্তায় শাহরিয়ারের কণ্ঠে ছিল একটাই আকুতি, 'বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ—আমাদের দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হোক। আমরা খুবই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।'

শাহরিয়ার রাশিয়ায় যাওয়ার পর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী খালেদা আক্তারের কোলজুড়ে আসে ছেলে ইরফান আহমেদ। এখন তার বয়স ৯ মাস। বাবাকে সে কখনো দেখেনি। খালেদা আক্তার বলেন, শেষবার ফোনে শাহরিয়ার বলেছিল, 'আমার জন্য দোয়া করো। যদি বাইচ্চা থাকি, তোমাদের সঙ্গে দেখা হইবো।' এরপর আর কথা হয়নি। পরে শুনেছেন, তিনি মারা গেছেন। কিন্তু কয়েক দিন আগে ভিডিওতে তাঁকে বেঁচে থাকতে দেখে তিনি বলেন, 'আমার স্বামী কাজ করতে গিয়েছিল, যুদ্ধ করতে নয়। দালালেরা প্রতারণা করে এই অবস্থায় ফেলেছে। আমি শুধু চাই, সরকার ওকে ফিরিয়ে আনুক। আমার সন্তান আজও তার বাবাকে দেখেনি।'

শাহরিয়ারের পরিবার ইতিমধ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে লিখিত আবেদন করেছে। শাহরিয়ারের ভগ্নিপতি আনোয়ার হুসাইন বলেন, ইউক্রেনের কারাগার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে শাহরিয়ারকে আবার রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। তাই দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তিনি জানান, লিখিত আবেদন করলেও সরকারি পর্যায় থেকে এখনো তাঁরা কোনো আশ্বাস পাননি। বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী।