যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে ‘ভিসা বন্ড’ ব্যবস্থা। প্রায় এক বছর পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর পর ৩ আগস্ট ২০২৬ থেকে বি-১ (ব্যবসা) ও বি-২ (পর্যটন ও চিকিৎসা) ভিসার ক্ষেত্রে এই নীতি স্থায়ীভাবে কার্যকর হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবেই এই পদক্ষেপকে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।
বাংলাদেশসহ ৫০টি দেশের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য এই নীতির আওতায় নির্দিষ্ট আবেদনকারীদের ভিসা পাওয়ার আগে ১০ হাজার, ১৫ হাজার বা সর্বোচ্চ ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ফেরতযোগ্য বন্ড জমা রাখতে হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ লাখ থেকে ২৪ লাখ টাকা। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবৈধভাবে অবস্থান (ওভার স্টে) করার প্রবণতা কমানোই এই নীতির মূল লক্ষ্য। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজ দেশে ফিরলে বন্ডের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে, আর শর্ত লঙ্ঘন করলে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে।
প্রথম দৃষ্টিতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ মনে হলেও, এর প্রভাব শুধু অভিবাসনব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বৈশ্বিক চলাচল, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির নতুন বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল ওভার স্টে ঠেকানোর উদ্যোগ, নাকি ভিসা নীতিকে কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের নতুন অধ্যায়?
২০২৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল যেসব আবেদনকারীর ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের ঝুঁকি বেশি, তাদের নিরুৎসাহিত করা। পাইলট পর্যায়ে বন্ডের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার, যা স্থায়ী নীতিতে বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ১০ হাজার ও সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এটি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। ভিসা সাক্ষাৎকার শেষে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, আর্থিক সক্ষমতা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্য বিবেচনা করে কনস্যুলার কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নেবেন বন্ড প্রয়োজন কি না এবং কত টাকা হবে।
মার্কিন প্রশাসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যেসব দেশের নাগরিকদের মধ্যে ভিসা ওভার স্টের হার বেশি এবং যেসব দেশ নিরাপত্তা বা পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করে না, তাদের জন্যই এই নীতি প্রযোজ্য। তালিকাভুক্ত দেশগুলোর বড় অংশ আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল অঞ্চলের। এখান থেকেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, যদি ওভার স্টের হারই মানদণ্ড হয়, তাহলে ইউরোপের কিছু দেশ বা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থা কেন নেওয়া হচ্ছে না? অনেক দেশ ভিসা ওয়েভার কর্মসূচির আওতায় থাকায় তাদের নাগরিকদের জন্য প্রবেশাধিকার সহজ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা বন্ড নীতিকে অন্তত তিনটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভোটারদের বার্তা: অভিবাসন যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভিসা অপব্যবহার প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকে। ভিসা বন্ড এমন একটি ব্যবস্থা যা একদিকে কঠোরতার বার্তা দেয়, অন্যদিকে বৈধ ভ্রমণের পথ খোলা রাখে। দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের উপায়: যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভিসা নীতিকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভিসা বন্ডের মাধ্যমে ওয়াশিংটন অংশীদার দেশগুলোকে অভিবাসন ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় আরও সক্রিয় হতে উৎসাহিত করতে চায়। তৃতীয়ত, ব্যয় কমানো ও ‘ইউজার পে’স নীতি: প্রতিবছর অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও ফেরত পাঠাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। ভিসা বন্ড সেই ব্যয়ের একটি অংশ আগেভাগেই সুরক্ষিত করার চেষ্টা, যার দায় করদাতাদের বদলে ভ্রমণকারীর ওপর চাপানো হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব প্রসঙ্গে, বন্ডটি ফেরতযোগ্য হলেও ১০-২০ হাজার ডলার দীর্ঘ সময়ের জন্য জমা রাখা উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ী, চিকিৎসাপ্রার্থী বা পর্যটকরা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত ভ্রমণ ব্যয় বাড়াবে না, বরং ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও চিকিৎসা–ভ্রমণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া, বন্ডের অর্থ জোগাড়ের জন্য কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের পথ খুঁজতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ কেন তালিকায় তা নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ২০২৪ অর্থবছরের ওভার স্টে প্রতিবেদন অনুযায়ী, বি-১/বি-২ ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া ৩৮ হাজার ৫৯০ জন বাংলাদেশির মধ্যে ২ হাজার ২১৩ জন সময়মতো দেশ ছাড়েননি। এতে বাংলাদেশের ওভার স্টের হার ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে এই অন্তর্ভুক্তি ব্যাখ্যা করা কঠিন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন—মানবাধিকার, আঞ্চলিক কৌশল ও ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতি—এটিও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক কারণের কথা বলেনি; তাদের ব্যাখ্যা মূলত ওভার স্টে ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর কেন্দ্রীভূত।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য প্রথম কাজ হওয়া উচিত ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিয়মিত ও তথ্যভিত্তিক সংলাপ বৃদ্ধি করা। প্রকৃত ব্যবসায়ী, চিকিৎসাপ্রার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য বন্ডের পরিমাণ কমানো বা বিকল্প ব্যবস্থা রাখা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এছাড়া, ভিজিটর ভিসায় গিয়ে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা রোধে গণমাধ্যম, ট্রাভেল এজেন্সি ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত সচেতনতামূলক উদ্যোগ প্রয়োজন। ভিসা নীতি এখন শুধু অভিবাসনের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অংশ। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের কঠোর নীতির ঝুঁকি কমতে পারে।
সর্বোপরি, ভিসা বন্ড নীতি আধুনিক বিশ্বের অভিবাসন–ব্যবস্থায় নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এটি কেবল অতিরিক্ত আর্থিক শর্ত নয়, বরং ভিসা নীতিকে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার উদাহরণ। ওয়াশিংটনের দাবি, এই নীতির উদ্দেশ্য ওভার স্টে কমানো ও করদাতাদের অর্থ সুরক্ষা করা। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বের নাগরিকদের জন্য আন্তর্জাতিক চলাচলে নতুন আর্থিক বৈষম্য তৈরি হবে এবং বৈধ ভ্রমণও নিরুৎসাহিত হতে পারে। ভিসা বন্ড নীতি কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় এখনই স্পষ্ট—ভিসা আর শুধু ভ্রমণের অনুমতিপত্র নয়; এটি এখন ভূরাজনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।


