২০১২ সালে গোপালগঞ্জে সংঘটিত এক শিশুহত্যা মামলায় দীর্ঘ ১৪ বছর পর রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। গত ৭ জুলাই ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক ফারজানা ইয়াসমিন এ মামলার রায় দেন। রায়ে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন জামাল শেখ, শামীম শেখ ও রঞ্জু শেখ। অন্যদিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন মাহমুদা খানম উষা ও বিল্লাল শেখ। যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত দুজনকে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডও করা হয়েছে।
ঘটনার শুরু ২০১২ সালের ৫ জুলাই। পবিত্র শবে বরাতের রাতে কাশিয়ানী উপজেলার বরাশুর গ্রাম থেকে ভাটিয়াপাড়া রেলওয়ে জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেলে তুলে অপহরণ করা হয় আট বছরের মাহফুজকে। এর আগে ২ জুলাই ভাটিয়াপাড়া বাজারে এক গোপন বৈঠকে অপহরণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাদীপক্ষের সঙ্গে আসামি বিল্লাল শেখের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিশোধ নেওয়া এবং মুক্তিপণ আদায় করা।
অপহরণের পর পরিবারের কাছে বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বর থেকে প্রথমে ৩ লাখ, পরে ৫০ লাখ এবং সর্বশেষ ৭০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। প্রায় ৪৫ দিন শিশুটিকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরিয়ে গোপনে আটকে রাখা হয়। দাবি অনুযায়ী টাকা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ২০ আগস্ট দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে আসামি মাহমুদা খানম উষার বাড়িতে শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরনের প্যান্ট গলায় পেঁচিয়ে হত্যার পর মরদেহ বাড়ির পাশের একটি মেহগনিবাগানে ফেলে রাখা হয়।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, ‘একটুকরা তাজা প্রাণকে তাঁরা রূপান্তর করলেন স্রেফ কিছু কাগজের টাকার দর-কষাকষির পণ্যে। দীর্ঘ প্রায় দেড় মাস ধরে এক অন্ধকার, অচেনা বন্দিশালায় অবরুদ্ধ রেখে ক্ষুধা আর আতঙ্কে নীল হয়ে যাওয়া শিশুটির ওপর চালানো হয়েছিল অবর্ণনীয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। মুক্তিপণের লোভ পূরণ না হওয়ায় মানুষের চামড়া পরিহিত সেই হিংস্র হায়েনারা মেতে উঠেছিল রক্ত হিম করা এক হত্যাযজ্ঞে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি শুধু একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের আইনি খতিয়ান নয়, মানুষের রূপধারী কিছু অপরাধীর হিংস্রতার বলি হওয়া এক নিষ্পাপ শিশুর অকালে ঝরে যাওয়ার করুণ ইতিহাস।’
হত্যার পরদিন ২০১২ সালের ২১ আগস্ট শিশুটির মা স্বপ্না বেগম কাশিয়ানী থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে ওই বছরের ২০ নভেম্বর পুলিশ অভিযোগপত্র জমা দেয়। ২০১৩ সালে মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এ স্থানান্তর করা হয়। ২০১৪ সালে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নিজাম শিকদারের তদন্ত এবং আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপিত হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, ট্রাইব্যুনালের পিপি গিয়াস উদ্দীন জানান, রাষ্ট্রপক্ষে ২৩ জন এবং আসামিপক্ষে আটজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর আগে একই ঘটনায় জড়িত দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে পৃথক বিচারে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত। তিনি আরও জানান, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিই জামিনে ছিলেন এবং নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতেন। তবে রায়ের দিন তাঁরা আদালতে উপস্থিত হননি। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি হয়েছে।
বিচারে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়ে পিপি গিয়াস উদ্দীন বলেন, আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। আওয়ামী লীগের সময়ে এই মামলায় সাক্ষ্য দিতে রাজি হতেন না সাক্ষীরা। ফলে মামলার রায় পর্যায়ে আসতে দেরি হয়েছে। তবে ৫ আগস্টের পর মামলার অগ্রগতি বেড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।



