চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনের আলোতে দলবেঁধে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র হামলার ঘটনা প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ ও তার অনুসারীরা। দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রটির বেপরোয়া তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকরভাবে তাদের দমন করতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

সন্ত্রাসীদের তৎপরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে নগরের চান্দগাঁও, বাকলিয়া, বায়েজিদ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া। পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদ বিদেশে অবস্থান করেই চট্টগ্রামে খুন ও চাঁদাবাজির নির্দেশনা প্রদান করছে। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অর্ধশতাধিক সক্রিয় সদস্যের বাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষতা ও পাহাড়ি এলাকায় আস্তানা থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সর্বশেষ সোমবার দুপুরে নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কে অবস্থিত ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুন জানান, দুই দিন আগে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে মোবারক হোসেন ইমন পরিচয়ধারী একজন তার কাছে দুই কোটি টাকা এককালীন ও মাসিক দশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় ১৫-২০ জনের একটি সশস্ত্র দল অফিসে প্রবেশ করে কম্পিউটার, কর্মচারীদের মোবাইল ফোন ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। কুড়াল দিয়ে সরঞ্জাম ভাঙচুরের দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে।

এর আগে গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মাসুদুল দৌড়াচ্ছেন এবং পেছনে অস্ত্রধারীরা তাকে তাড়া করছে। একটি মোটরসাইকেলে ধাক্কা লেগে মাটিতে পড়ে গেলে অস্ত্রধারীরা তাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছোড়ে। প্রথম দফায় গুলি করে ফিরে যাওয়ার পর পুনরায় এসে আবারও গুলি করা হয়। ঘটনার পর সন্ত্রাসীরা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চলে যায়। মাসুদুলের বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী রাউজান থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় মোহাম্মদ রায়হান, মোহাম্মদ ইলিয়াস, মোহাম্মদ মোবারক, দিদারুল আলম ও মোহাম্মদ ইউসুফসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পেয়ারুল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, এক মাস পেরিয়ে গেলেও প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীদের কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তার ভাইকে হত্যার বিচার তিনি পাবেন কিনা এবং কারা অস্ত্রধারীদের পাঠিয়েছে তাদেরও খুঁজে বের করার দাবি জানান।

গত ৮ মে রাতে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনি এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামের এক যুবককে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখে মাস্ক পরা পাঁচ-ছয়জন ব্যক্তি সবাই আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হাসান রাজুকে তাড়া করে এবং মুহুর্মুহু গুলি ছোড়ে। এক পর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাকে পা দিয়ে চেপে ধরে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, রাউজানের একটি হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী পলাতক সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হানের নাম এই ঘটনায় জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। নগর ও রাউজানের অন্তত ১৪টি খুনের ঘটনায় রায়হানের নাম উঠে এসেছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ছয়টায় নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলি চালানো হয়। বাসাটিতে পুলিশের পাঁচ সদস্য পাহারায় থাকা সত্ত্বেও এই ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একজন সন্ত্রাসী দুই হাতে দুটি পিস্তল থেকে গুলি ছুড়ছে। বাকি তিনজনের মধ্যে একজনের হাতে সাব মেশিনগান (এসএমজি), একজনের কাছে চায়নিজ রাইফেল ও আরেকজনের কাছে শটগান ছিল। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুরের দাবি, কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যেই গুলি চালানো হয়। এর আগে গত ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলি চালানো হয়েছিল।

গত বছরের ২৯ মার্চ নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে সরোয়ার হোসেনকে লক্ষ্য করে প্রাইভেট কারে গুলি চালানো হয়। ওই সময় গাড়িতে থাকা দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। সরোয়ার বেঁচে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি; ৩ নভেম্বর পাঁচলাইশ চালিতাতলী এলাকায় বিএনপি প্রার্থীর গণসংযোগের সময় ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। নিহত সরোয়ারের ভাই আজিজ উদ্দিন অভিযোগ করেন, সরোয়ারকে গুলি করা শুটারকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ; উল্টো বড় সাজ্জাদ তাদের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন।

গত বছরের ২৯ আগস্ট নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার অনন্যা আবাসিক ও কুয়াইশ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় মো. আনিস ও মাসুদ কায়সার নামের দুই যুবককে। পুলিশের মতে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসা ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। মামলা দুটিতে সাজ্জাদ ও তার সহযোগীদের আসামি করা হয়েছে।

চাঁদা না পেয়ে হামলার আরও বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানার কুয়াইশ রোডের উত্তরা হাউজিং এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে গুলি চালানো হয়। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর নগরের চান্দগাঁও হাজীরপুল এলাকায় ঠিকাদার মো. হাছানের বাসায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে গুলি করা হয়। গত বছরের ২০ আগস্ট হাটহাজারীতে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরের বাড়িতেও একই কারণে গুলি চালানো হয়। ১৪ ডিসেম্বর পাঁচলাইশ হামজারবাগ এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনে সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে শ্রমিকদের মারধর করে।

পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী দাবি করেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই এবং ইতিমধ্যে অস্ত্রসহ সাজ্জাদ বাহিনীর কিছু সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ব্যক্তিদের ধরতেও পুলিশ কাজ করছে। তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থানা-পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের বিশেষ শাখাকেও সন্ত্রাসীদের নজরদারিতে রাখা উচিত। এ জন্য পুলিশের সোর্সকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং সন্ত্রাসীদের পেছনে কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে, সাজ্জাদ আলী নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি চাঁদাবাজি বা খুনের সঙ্গে জড়িত নন; বরং সন্ত্রাসীরা তার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে যার বিচার তিনি এখনো পাননি। তবে পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের অনুসারী মোবারক হোসেন ইমন, মোহাম্মদ রায়হান ও বোরহান উদ্দিন বর্তমানে দেশে বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বড় সাজ্জাদ ২০০০ সালের ১ অক্টোবর একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে পুলিশ জানায়।