নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর অন্যতম পুরনো স্থাপনা কায়সার মহল। রানা বংশের ফিল্ড মার্শাল শমসের জঙ্গ বাহাদুরের হাতে গড়া এই প্রাসাদের পাশেই বিখ্যাত ‘গার্ডেন অব ড্রিমস’ বা স্বপ্নের বাগান। ফোয়ারা ও পদ্মফোটা জলাশয়ে ঘেরা এই বাগিচায় সম্প্রতি এক সাংবাদিক উপস্থিত হন স্থানীয় গবেষক সূর্যনাথ কৈরালার সঙ্গে দেখা করতে। কৈরালা তাকে এখানে আসতে বলেছিলেন পুরনো বাংলা পাণ্ডুলিপি দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

কায়সার মহলের লাইব্রেরিতে রাখা এসব পাণ্ডুলিপির সন্ধানেই সেদিন বিকেলে সেখানে হাজির হন তিনি। কিন্তু কৈরালা এসে পৌঁছাতে দেরি হয়। এদিকে অপেক্ষার ফাঁকে বাগানের নান্দনিকতা উপভোগ করেন তিনি। ইউরোপীয় ধাঁচের এই বাগানে আছে নানা প্রজাতির বিরল গাছ, কৃত্রিম জলাধার এবং পাখিদের জন্য বার্ড-হাউস। নেপালের ঋতুগুলোর নামানুসারে ছয়টি মণ্ডপও রয়েছে এখানে। বসন্ত, গ্রীষ্ম, শরৎ, হেমন্ত, বর্ষা ও শীত—যাকে নেপালি ভাষায় ‘বরখা’ ও ‘শিশির’ বলা হয়—প্রত্যেকের জন্য আলাদা স্থান।

অবশেষে কৈরালা এসে পৌঁছালে দুজনে মিলে প্রাসাদের লাইব্রেরিতে প্রবেশ করেন। ভোলানাথ শ্রেষ্ঠা নামের এক দপ্তরি তাদের স্বাগত জানান। নিচতলায় হাজার হাজার বইয়ের সংগ্রহ ছড়ানো। উনিশ শতকের শেষ দিকে লন্ডন, প্যারিস, মিলান ও ভিয়েনা থেকে ছাপা বহু বই আছে। রানার মহিষী কৃষ্ণা চন্দ্রা দেবী নিজে প্রায় পঞ্চাশ হাজার গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন। ট্যাক্সিডার্মি করে সংরক্ষিত একটি বাঘের মূর্তিও সবার নজর কাড়ে।

দোতলায় ওঠার পর করিডোরে দেখা যায় অনেকগুলো তৈলচিত্র। গান্ধীজি ও মাও সে-তুংয়ের প্রতিকৃতির পাশাপাশি পণ্ডিত হরপ্রাসাদ শাস্ত্রীর ছবিও আছে। এই বাঙালি গবেষকই নেপালের রাজকীয় লাইব্রেরিতে চর্যাগীতিকার পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেছিলেন। এরপর শ্রেষ্ঠা তাদের একটি প্রায়-অন্ধকার কক্ষে নিয়ে যান, যেখানে কাঠের সিন্দুকে রাখা আছে বাংলা পাণ্ডুলিপি। সিন্দুক খোলার চাবি পাওয়া যায়নি। তবে টানাহেঁচড়া করে একটি দেরাজ খুলে বের করা হয় তালপাতার একটি পুঁথি। সেটি দেখতে অনেকটা গীতগোবিন্দের সমগোত্রীয়। কিন্তু পুঁথিটি এতটাই পুরনো যে স্পর্শ করামাত্রই ভেঙে গুঁড়া হতে থাকে।

এ সময় আরশোলা ও টিকটিকির উপদ্রবও দেখা দেয়। একপর্যায়ে পাঁচটি টিকটিকি তাদের দিকে ছুটে এলে তারা ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। শ্রেষ্ঠা জানান, চাবি খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রাক্তন দপ্তরি থাপালিয়ার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। তবে সাংবাদিক নেপাল ছেড়ে যাওয়ার সময় হওয়ায় আর ফিরতে রাজি হননি।

শেষ বিকেলে পদ্মফোটা জলাশয়ের পাশে বসে চা-পাকোড়া খেতে খেতে কৈরালা জানান, রানার মহিষীর সময় থেকে পরিযায়ী পাখিরা প্রতি বসন্তে এই বাগানে আসে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাখিগুলো এখনো এখানে ফিরে আসে। পাখি দেখতে দেখতে সাংবাদিকের মনে হয়, পাণ্ডুলিপির খোঁজের চেয়ে পাখি পর্যবেক্ষণই বেশি আনন্দদায়ক।