এক সাম্প্রতিক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা থেকে সাইবার বুলিংয়ের ভয়াবহ মানসিক প্রভাব ফুটে উঠেছে। এক কিশোরীর গল্পে দেখা যায়, ফেসবুকে নিজের ছবি পোস্ট করার পর একদল ব্যক্তি সংঘবদ্ধভাবে আপত্তিকর মন্তব্য করতে থাকে। প্রাথমিক প্রতিবাদ সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ভুক্তভোগী ছবিটি মুছে ফেলতে বাধ্য হন। কিন্তু ছবি অপসারণ করলেও অপমানের তীব্র যন্ত্রণা তার মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে তিনি ধীরে ধীরে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বিশেষজ্ঞরা সাইবার বুলিং হিসেবে চিহ্নিত করেন।

কেমব্রিজ ডিকশনারির সংজ্ঞা অনুযায়ী, কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভীতিপ্রদর্শন, অপমান, মানসিক যন্ত্রণা প্রদান বা অনিচ্ছুক কোনো কাজে বাধ্য করাই হলো বুলিং। এই সমস্যা এখন বিশ্বব্যাপী একটি জটিল সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে, যার প্রধান শিকার শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা। বাংলাদেশেও এর প্রভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। বুলিংয়ের সবচেয়ে পরিচিত দুটি রূপ হলো স্কুল বুলিং ও সাইবার বুলিং। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক বা একাধিক শক্তিশালী শিক্ষার্থী কর্তৃক তুলনামূলক দুর্বল কোনো শিক্ষার্থীকে বারবার উত্ত্যক্ত করা, ভয় দেখানো বা শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করাই স্কুল বুলিং। এই ঘটনা নতুন নয়, তবে এর পরিণতি সুদূরপ্রসারী। অনেক শিক্ষার্থী বুলিংয়ের ভয়ে স্কুলে যেতে অনিচ্ছুক হয়, পড়াশোনার আগ্রহ হারায় এবং চরম মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা স্কুল ত্যাগ করতেও বাধ্য হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে স্কুল বুলিংয়ের সম্মুখীন হয়। এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জরুরি প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়। মনোবিজ্ঞানীরা প্রায়ই ছোটখাটো উসকানিমূলক আচরণ উপেক্ষা বা ক্ষমা করে দেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু পরিস্থিতি যখন নিয়মিত নির্যাতনের রূপ নেয় এবং ব্যক্তির নিরাপত্তা বা মানসিক সুস্থতার জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, তখন দৃঢ় প্রতিবাদ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা গ্রহণ আবশ্যক। বুলিং যেখানেই সংঘটিত হোক, সেখানেই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে, সাইবার বুলিং ডিজিটাল মাধ্যম যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ বা অনলাইন গেম ব্যবহার করে অপমান, হুমকি ও হয়রানি করার কৌশল। প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে এ ধরনের হয়রানির প্রকোপও বাড়ছে। একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, সামাজিক মাধ্যমে কাউকে কটু কথা বলা বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কটাক্ষ করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা প্রতিবাদের অংশ। কিন্তু একজন ব্যক্তির পোশাক-পরিচ্ছদের মতো ব্যক্তিগত পছন্দে হস্তক্ষেপ করা মোটেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়, বরং তা সরাসরি বুলিংয়েরই একটি রূপ। কারও কাজের যৌক্তিক সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। গালিগালাজ, হেয় প্রতিপন্ন করা বা ব্যক্তিকে আক্রমণ করা কখনোই গ্রহণযোগ্য আচরণ হতে পারে না। প্রতিবাদের ভাষা হতে হবে শালীন, যুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বশীল।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেকেই সাইবার বুলিং প্রত্যক্ষ করেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। অথচ এই নীরবতাই অনেক ক্ষেত্রে বুলিংকে অধিকতর উৎসাহিত করে। যদি কেউ নিজে বা পরিচিত কেউ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়, তবে বিষয়টি গোপন না করে অভিভাবক, শিক্ষক বা বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানানো, স্ক্রিনশট সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি সহায়তা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষার বিধানও বিদ্যমান। সর্বোপরি, নিজে বুলিং থেকে বিরত থাকা এবং অন্য কারও দ্বারা সংঘটিত হলে তার সোচ্চার প্রতিবাদ জানালে এই সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। একটি কটু মন্তব্যও কারও মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে, তাই অনলাইন বা অফলাইন সর্বত্র আচরণ হওয়া উচিত সহানুভূতিশীল, দায়িত্বশীল এবং সম্মানজনক।