গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে প্লাস্টিকের বোতলে রাখা পানি পান করাকে কেন্দ্র করে নতুন করে সতর্কতা জারি করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও রসায়নবিদরা। অনেকে মনে করলেও, রোদে পড়ে থাকা বোতলের পানি শুধু গরম হয় না; বরং এতে ঘটে বিপজ্জনক রাসায়নিক পরিবর্তন। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে তাপ বা সরাসরি সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকলে প্লাস্টিকের বোতল থেকে অ্যান্টিমনি ও বিসফেনল এ (বিপিএ)-এর মতো ক্ষতিকর উপাদান পানিতে নির্গত হতে শুরু করে। তাপমাত্রা যত বাড়ে, এই প্রক্রিয়ার গতিও তত বেড়ে যায়।
সাধারণত ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পানির বোতলগুলো পলিইথিলিন টেরেফথালেট বা পিইটি (PET) দিয়ে তৈরি। শীতল পানীয় ও তরল খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে এই প্লাস্টিকের বহুল ব্যবহার থাকলেও, এটি পরিবেশ ও স্বাস্থ্য—উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। লন্ডনের ব্রুনেল ইউনিভার্সিটির পরিবেশ গবেষক এলেনি ইয়াকোভিডুর মতে, বোতলকে শক্ত ও নির্দিষ্ট আকার দিতে এতে নানা রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয়। ২০২২ সালের এক গবেষণায় তাঁর দল প্রমাণ করে, প্লাস্টিকের বোতল থেকে রাসায়নিক উপাদান আসলেই পানির সঙ্গে মিশে যায়—একেক বোতলে এর পরিমাণ একেক রকম।
বিশ্বের অনেক উষ্ণ দেশে নলকূপের পানি পানযোগ্য না হওয়ায় মানুষ বোতলজাত পানির ওপর নির্ভরশীল। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই এই গবেষণা চালানো হয়। ইয়াকোভিডু স্পষ্ট করে বলেন, পিইটি প্লাস্টিকের বোতল কখনোই কড়া রোদ বা অতিরিক্ত গরমে রাখা উচিত নয়। তাপ প্লাস্টিকের অভ্যন্তরীণ গঠনকে দুর্বল করে দেয়, ফলে দ্রুত ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো পানিতে ছড়িয়ে পড়ে।
প্লাস্টিকের বোতল থেকে নির্গত রাসায়নিকের মধ্যে থ্যালেট এস্টার নামক উপাদানটি মানবদেহের হরমোন ব্যবস্থার ক্ষতি করতে সক্ষম। তবে অন্যান্য রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে এখনো গবেষণা চলছে। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ নানা উৎস থেকে রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে বলে নির্দিষ্ট কোনো প্রভাব চিহ্নিত করাও কঠিন। তাই বিশেষজ্ঞরা প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে প্লাস্টিকের পাত্র গরম করা একেবারেই অনুচিত, কারণ তাপের সংস্পর্শে এলে রাসায়নিক দ্রুত খাদ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অ্যাসিডিক খাবার, ফলের রস ও চর্বিযুক্ত খাবার প্লাস্টিকের সংস্পর্শে এলে এই ছড়ানোর হার আরও বেড়ে যায়।
পানির বোতল সংরক্ষণের সর্বোত্তম উপায় সম্পর্কে গবেষকরা জানান, সব সময় ঠান্ডা ও অন্ধকার জায়গায় বোতল রাখতে হবে। ঘরের আলমারি গরম হলেও সেখান থেকেও রাসায়নিক নিঃসরণ ঘটতে পারে। আন্তর্জাতিক বোতলজাত পানি সংস্থার (আইবিডব্লিউএ) পরামর্শ, বোতলের পানি ঘরের স্বাভাবিক বা তার চেয়ে কম তাপমাত্রায় রাখা ভালো। সরাসরি সূর্যালোক থেকে দূরে রাখা জরুরি। পরীক্ষায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছালেই প্লাস্টিক থেকে রাসায়নিক নির্গমন শুরু হয়। তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়। এ কারণে গবেষকরা নিজেরাই প্লাস্টিকের বদলে ধাতব বোতল ব্যবহার করেন।
শেষ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞদের বার্তা স্পষ্ট: গরমের দিনে প্লাস্টিকের বোতল বা পাত্র সরাসরি রোদে ফেলে রাখা যাবে না। আর বোতলের পানি গরম হয়ে গেলে বা রোদে পড়ে থাকলে তা পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।




