২০১৬ সালের নির্বাচনের পর এক দশক পেরিয়ে গেলেও ডেমোক্র্যাটিক পার্টি যে এখনও একই কৌশলগত ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি করছে, এমনটাই দাবি করছেন বার্নি স্যান্ডার্সের সাবেক প্রধান নির্বাচনী কৌশলবিদ ট্যাড ডিভাইন। সোমবার ফরচুন ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন। ডিভাইন মূলত পার্টির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ সীমিত করার প্রবণতাকে দায়ী করছেন বারবার নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য।

রোড আইল্যান্ড থেকে ওয়াশিংটনগামী গাড়িতে বসে ২০১৬ সালে ডিভাইন ১২৫ জন সাংবাদিককে ফোন করে বলেছিলেন, হিলারি ক্লিনটন সাধারণ নির্বাচনে দুর্বল প্রার্থী। নিউ হ্যাম্পশায়ারে স্যান্ডার্সের বিপুল জয়ের পর তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, উন্মুক্ত প্রাইমারিতে ক্লিনটনের প্রতি ভোটারদের অনীহাই প্রমাণ করে যে পার্টি ভুল ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিতে চলেছে। তার সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয় এবং ট্রাম্প উইসকনসিন, মিশিগান ও নিউ হ্যাম্পশায়ার—যেসব রাজ্যের কথা তিনি আগেই চিহ্নিত করেছিলেন—সেগুলোতে জয়লাভ করেন। তখন তাকে নারীবিদ্বেষীসহ নানা আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ‘হাউ দ্য ডেমোক্র্যাটস স্ক্রুড বার্নি’ শিরোনামের একটি বই লিখেছেন ডিভাইন, যা ৭ জুলাই প্রকাশিত হয়েছে। তার বক্তব্যের মূল উপজীব্য স্যান্ডার্স নন, বরং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে ক্ষমতা ধরে রাখার পদ্ধতি এবং এর ফলে ভোটাররা সমীকরণের বাইরে পড়ে গেলে পার্টির কী মূল্য দিতে হয়।

ডিভাইনের ভাষায়, ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটি (ডিএনসি) ক্লিনটনের প্রচার শিবিরের সাথে সক্রিয়ভাবে সমন্বয় করে স্যান্ডার্সকে ঠেকানোর চেষ্টা করছিল—এটা এখন আর বিতর্কের বিষয় নয়। ২০১৬ সালের কনভেনশনের সময় ফাঁস হওয়া ডিএনসির ইমেইল তা নিশ্চিত করেছে। ফরচুনের মন্তব্যের অনুরোধে ডিএনসি তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি। নেভাডার উদাহরণ টেনে ডিভাইন জানান, স্যান্ডার্স যখন সেখানে গতি পাচ্ছিলেন, তখন তৎকালীন সিনেট ডেমোক্র্যাটিক নেতা হ্যারি রিড সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিলেন। সাংবাদিক জন র্যালস্টনের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, নেভাডার ককাসে ক্লিনটনের জয় ছিল প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছাকৃত প্রয়াসের ফল। কোনো ভোট পড়ার আগেই ক্লিনটন প্রায় ৮০০ সুপার ডেলিগেটের সমর্থন নিশ্চিত করেছিলেন, যা মনোনয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের প্রায় ৪০ শতাংশ। ডিভাইন স্মরণ করেন, আইওয়ার ককাসে নাটকীয় ব্যবধানে জেতার পর থেকেই ক্লিনটনের প্রচারণার মূল বার্তা ছিল তার ‘অনিবার্যতা’, আর তার ভিত্তি ছিল সুপার ডেলিগেটরা। নির্বাচনের পর ডিএনসি এই ব্যবস্থা সংস্কার করলেও ডিভাইনের মতে এটি কেবল শুরু, লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখনও অনেক পথ বাকি।

তার থিসিসের মূল ভিত্তি হলো সেই উন্মুক্ত প্রাইমারিগুলো, যেখানে স্বতন্ত্র ভোটাররা নির্বাচনের ফলাফল ঘুরিয়ে দিতে পারে। ২০১৬ সালে এসব রাজ্যের স্বতন্ত্র ভোটাররা ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে স্যান্ডার্সকে ভোট দিলেও সাধারণ নির্বাচনে ট্রাম্পের দিকে ঝুঁকেছিলেন। ডিভাইনের যুক্তি, “রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বৈধ পরীক্ষা হলো এই প্রাইমারিগুলো।” লাখ লাখ মানুষের ভোট জরিপের চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য বলেই তিনি মনে করেন। ২০২০ সালের প্রসঙ্গে ডিভাইন বলেন, ভোটাররা বর্তমান অবস্থার বাইরে কিছু খুঁজছিলেন এবং তারা জো বাইডেন বা হিলারি ক্লিনটনের মতো প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র চাননি। এই ধারাবাহিক ভুল এবং সাম্প্রতিক ভয়াবহ পরাজয়গুলোই তাকে বই লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে। তার ভাষ্যে, “এখনই সেই সময়।”

নিউ ইয়র্কের ২০২৫ সালের মেয়র নির্বাচনের প্রাইমারিতে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত জোহরান মামদানির জয় প্রসঙ্গে ডিভাইন বলেন, জাতীয় পর্যায়ে যা ঘটেছে তার প্রতিধ্বনি নিউ ইয়র্কেও বিদ্যমান। ভোটার নিবন্ধনের জটিল নিয়মগুলো প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করে এবং তরুণ ভোটারদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে। একই দিনে নিবন্ধনের সুযোগ থাকলে ২০১৬ সালে আরও ৭০,০০০ নিউ ইয়র্কবাসী ভোট দিতে পারতেন বলে এনওয়াইএসিএলইউ-এর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ডিভাইন স্বীকার করেন, নিউ ইয়র্কে জয়ী হওয়া আর সাউথ ক্যারোলাইনায় প্রেসিডেন্ট প্রাইমারি জেতা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু স্যান্ডার্স কখনো নিজেকে ‘ডেমোক্র্যাট’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না, অন্যদিকে মামদানি প্রথম সাক্ষাৎকারেই নিজেকে ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। ডিভাইনের মতে, ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও কেউ যখন পার্টিকে আলিঙ্গন করে, তখন তা পার্টির জন্য দারুণ।

সার্বিকভাবে ডিভাইন মনে করেন, স্যান্ডার্সের বক্তব্য এখন আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমেরিকার অর্থনীতি আরও বৈষম্যমূলক হয়েছে, নির্বাচনী অর্থায়ন ব্যবস্থা আরও গেড়ে বসেছে। “আমেরিকার অর্থনীতি কারচুপিপূর্ণ, যা দুর্নীতিগ্রস্ত নির্বাচনী অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ধরে রাখা হয়েছে। এই বার্তা যিনি ধরবেন, তিনি গোটা জাতির মন জয় করবেন।” প্রতিষ্ঠানের সমর্থন ছাড়া সাধারণ প্রার্থীর পক্ষে জটিল নিয়মগুলো বুঝে ওঠা প্রায় অসম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন। পার্টির উচিত সহনশীলতা দেখানো এবং ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়া, যাতে ভোটারদের কথা শোনার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, ফলাফল নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রবণতা নয়। তবেই সবখানে জয় আসবে বলে ডিভাইন বিশ্বাস করেন।